জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন কালজয়ী কবি নন, তিনি বাঙালির জীবন, চেতনা ও প্রতিবাদের ভাষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাঁর মতে, অন্যায়, শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস আজও নজরুলের কবিতা ও গান থেকে পাওয়া যায়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে এসব কথা বলেন রিজভী।
রিজভী বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম এ দেশের অন্যতম গুণী ও শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তিনি একই সঙ্গে দ্রোহের কবি ও প্রেমের কবি। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ শাখা নেই, যেখানে তাঁর বিচরণ ছিল না। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ও গান—বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে সব পরিচয়ের মধ্যে তাঁর প্রধান পরিচয় কবি।
তাঁর ভাষ্য, নজরুলের সাহিত্য শুধু সৌন্দর্য ও আবেগের প্রকাশ নয়; তাঁর লেখায় সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদও রয়েছে। ক্ষমতাবানদের হাতে দুর্বল মানুষের নিপীড়ন, সামাজিক বৈষম্য এবং অন্যায্যতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও সাহসী। সেই কারণে তাঁর সৃষ্টির আবেদন একটি নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে আটকে নেই।
রিজভী বলেন, সামাজিক অন্যায়-অবিচারের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেও নজরুলের লেখনী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কবিতা ও গানে বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা বারবার উঠে এসেছে।
নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর অবদান অসাধারণ। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সবচেয়ে বড় জায়গা তৈরি করেছেন সংগীতে। তাঁর বিপুলসংখ্যক গান বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
রিজভীর মতে, নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তাঁর ভাষার সরাসরি আবেদন। মানুষ যখন নিপীড়নের শিকার হয়, অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়ায় কিংবা চারপাশে হতাশা দেখতে পায়, তখন নজরুলের কবিতা ও গান তাকে ভয় কাটিয়ে প্রতিবাদ করতে উৎসাহ দেয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গণআন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিজভী বলেন, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও নজরুলের কবিতা ও গান আন্দোলনকারীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
তাঁর দাবি, বিভিন্ন সময়ে তরুণ, কিশোর ও শিশুরা নজরুলের গান গাইতে গাইতে রাজপথে নেমেছে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাদের মধ্যে সাহস তৈরি করেছে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শক্তি জুগিয়েছে।
রিজভী বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন নজরুলের দ্রোহের চেতনা মানুষকে প্রতিবাদে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক শক্তি তৈরি করে।
জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকীতে শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে নজরুলচর্চাকে সীমাবদ্ধ না রাখার আহ্বান জানান রিজভী। তাঁর মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের সাহিত্য ও চিন্তাধারা আরও বেশি করে পৌঁছে দিতে হবে।
তিনি বলেন, নজরুলকে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং মানুষের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। পরবর্তী প্রজন্ম যত বেশি তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম পড়বে এবং চর্চা করবে, তত বেশি তাঁর মানবিক ও প্রতিবাদী চেতনা তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
রিজভী আরও বলেন, নজরুলের সাহিত্য মানুষকে নির্ভীক হতে শেখায়। অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর যে শক্তি তাঁর সৃষ্টিতে রয়েছে, সেটিই তাঁকে আজও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে।
রিজভীর বক্তব্যে, নজরুলকে স্মরণ করার অর্থ কেবল তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন পালন নয়; বরং তাঁর সাহিত্য, মানবিকতা, সাম্যবোধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেতনাকে নিজেদের জীবন ও সমাজে ধারণ করা। সেই চর্চাই নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলকে আরও জীবন্ত করে রাখবে।