• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ন

রিয়ালের পতনে ইরানে এক কেজি গরুর মাংস ১ কোটি ৭৫ লাখ

newsline24 / ৯ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
রিয়ালের পতনে ইরানে এক কেজি গরুর মাংস ১ কোটি ৭৫ লাখ
রিয়ালের পতনে ইরানে এক কেজি গরুর মাংস ১ কোটি ৭৫ লাখ

ইরানে মুদ্রা রিয়ালের দরপতন অব্যাহত থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে ওষুধ, পোশাক ও শিশুখাদ্য—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে মানুষের ব্যয়। মুক্তবাজারে বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ২০ লাখ ২১ হাজার ৯৫০ রিয়াল। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পর রিয়ালের এই নজিরবিহীন অবমূল্যায়ন দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আরও চাপ তৈরি করেছে।

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের অর্থনীতি এমনিতেই সংকটে রয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশটিতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বাজারদর বিশ্লেষণে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য উঠে এসেছে। ছয় মাসের ব্যবধানে অনেক নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে, কোনো কোনো পণ্যে বেড়েছে কয়েক গুণ।

২০ লাখ রিয়ালে এখন কমছে বাজারের পরিমাণ

যুদ্ধের আগে ২০ লাখ রিয়াল দিয়ে প্রায় ৪ কেজি টমেটো, আধা কেজি মুরগির মাংস এবং প্রায় ১ লিটার রান্নার তেল কেনা যেত। এখন একই অর্থে এসব পণ্যের অর্ধেকেরও কম কেনা সম্ভব হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও রান্নার উপকরণ। ইনসুলিনের দাম বেড়েছে ৬৪২ শতাংশ। রান্নার তেলের দাম বেড়েছে ১৭৭ শতাংশ। মুরগির মাংসের দাম ৭৪ শতাংশ এবং টমেটোর দাম ৭১ শতাংশ বেড়েছে।

যুদ্ধের আগে এক কেজি টমেটোর দাম ছিল ৯ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ১০ হাজার রিয়ালে। কমলার দাম ১১ লাখ ১৭ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ লাখ রিয়াল। শসার দামও ৬ লাখ ৭০ হাজার থেকে বেড়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছে।

চালের দাম প্রতি কেজিতে ৫৩ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৪ লাখ রিয়াল। এক লিটার রান্নার তেলের দাম ২৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে ৬৮ লাখ রিয়াল হয়েছে। ডজন ডিমের দাম ২৮ লাখ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ লাখ রিয়ালে। চিনির কেজি ৯ লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ১৫ হাজার রিয়াল।

গরুর মাংসের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতি কেজির দাম ১ কোটি ৩৫ লাখ রিয়াল থেকে বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ রিয়াল। মুরগির মাংস ৪২ লাখ থেকে বেড়ে ৭৩ লাখ রিয়াল হয়েছে। শিশু খাদ্যের দাম কেজিপ্রতি ৮২ লাখ থেকে বেড়ে ১ কোটি ৬০ লাখ রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।

ওষুধের দামও বাড়ছে দ্রুত। এক পাতা প্যারাসিটামলের দাম ১৪ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ লাখ রিয়াল। আর ইনসুলিনের দাম ১২ লাখ থেকে বেড়ে ৮৯ লাখ রিয়ালে পৌঁছেছে। সাধারণ একটি শার্টের দামও ৪৫ লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০ লাখ রিয়াল।

শিশুর খরচ সামলাতে বিপাকে পরিবার

তেহরানের ৩৫ বছর বয়সী আফসানেহ এক বছরের শিশুকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, যুদ্ধের আগে তাঁদের আয় দিয়ে তিন থেকে ছয় মাসের বাজারের খরচ সামলানোর মতো অর্থ হাতে থাকত। এখন একই আয় দিয়ে এক মাসের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

আফসানেহ জানান, তাঁদের সাপ্তাহিক বাজারের খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে শিশুর খাবার, পরিচর্যা ও চিকিৎসার খরচে। একটি ডে-কেয়ার কেন্দ্রে শিশুকে রাখার দৈনিক খরচ এখন প্রায় ৫ লাখ তোমান, যা ৫০ লাখ রিয়ালের সমান।

ইরানে দৈনন্দিন লেনদেনে ‘তোমান’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ১ তোমান সমান ১০ রিয়াল। বড় অঙ্কের হিসাব সহজ করতে সাধারণ মানুষ রিয়ালের বদলে তোমানে দাম উল্লেখ করেন।

আফসানেহ বলেন, সরকার শিশু খাদ্যে ভর্তুকি দিলেও মাসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুষ্টি-সম্পূরক ওষুধ বিমার আওতায় নেই। ফলে সন্তানের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠেছে। বাড়তি খরচ সামলাতে নতুন পোশাক কেনা কিংবা গাড়ি পরিবর্তনের মতো পরিকল্পনা বাদ দিয়েছেন তাঁরা। এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য খাবার ও জরুরি ব্যয় মেটানো।

ক্রেতা কমায় ব্যবসায়ীদেরও সংকট

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ও এর প্রভাব পড়েছে। তেহরানের পুরুষদের পোশাক ব্যবসায়ী ৩৫ বছর বয়সী জামির জানান, গত বছরের তুলনায় তাঁর দোকানের বিক্রি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে।

তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকের মজুরি, কাঁচামাল ও পরিবহনসহ প্রায় সব ধরনের ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে ক্রেতারা প্রয়োজনের বাইরে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রি কমছে।

জামিরের আশঙ্কা, শীতের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই অনেক ব্যবসায়ী লোকসান সামলাতে না পেরে দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন। বর্তমানে অনেক দোকানে গ্রীষ্মকালীন পোশাক লোকসানে বিক্রি করা হচ্ছে। শরতে নতুন দামের প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

জামিরের হিসাবে, বাড়ি থেকে বের হয়ে আবার ফিরে আসার পথে কফি, সিগারেট, পানি ও যাতায়াতের খরচ মিলিয়ে ২০ লাখ তোমান পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। নিত্যপণ্যের বাজার বাদ দিলেও খুব হিসাব করে চললে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ লাখ তোমান খরচ হয়।

আয়ের তুলনায় ব্যয় বাড়ছে দ্রুত

দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের ২৮ বছর বয়সী সালামা একজন কর্মজীবী মা। তিনি হরমুজ উপকূলে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পরিবারও মূল্যবৃদ্ধির চাপে ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়েছে।

সালামা জানান, আগে ৫ লাখ তোমানে এক সপ্তাহের বাজার করা গেলেও এখন একই বাজার করতে প্রায় ৫০ লাখ তোমান প্রয়োজন হয়। ফলে মাংস ও মুরগি কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন তাঁরা।

শিশুদের সাধারণ সর্দি-কাশি বা মৌসুমি অ্যালার্জির ওষুধ কিনতেই এখন প্রায় ৩ লাখ তোমান লাগে। সাধারণ চিকিৎসকের কাছে একবার দেখাতে খরচ হয় কমপক্ষে ১০ লাখ তোমান।

ইরানের চলতি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১৬ কোটি ৬০ লাখ রিয়াল। বর্তমান বিনিময় হারে এর মূল্য প্রায় ৮২ ডলার। সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা যোগ করলেও মাসিক আয় ২২ কোটি রিয়ালের কম, অর্থাৎ প্রায় ১০৮ ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির গতি এত দ্রুত যে মাসের শুরুতে পাওয়া বেতনের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা পরবর্তী বেতন পাওয়ার আগেই কমে যায়। ফলে কাগজে-কলমে আয় একই থাকলেও সেই অর্থ দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে শুধু যুদ্ধ নয়, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ, হরমুজে নৌ অবরোধ, বেকারত্ব এবং স্থবির মজুরিও ভূমিকা রাখছে। রিয়ালের ধারাবাহিক দরপতন সেই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

ফলে ইরানের সাধারণ মানুষের সামনে এখন দুটি বড় সমস্যা—আয় সীমিত, অথচ নিত্যদিনের খরচ দ্রুত বাড়ছে। খাবার, চিকিৎসা ও শিশুর প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই যখন পরিবারের বড় অংশের আয় চলে যাচ্ছে, তখন পোশাক, সঞ্চয় কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category