• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন

রংপুরের চার খু/নে পুলিশের বয়ানে মিলল নতুন তথ্য

newsline24 / ৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
রংপুরের চার খুনে পুলিশের বয়ানে মিলল নতুন তথ্য
রংপুরের চার খুনে পুলিশের বয়ানে মিলল নতুন তথ্য

রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানিয়েছেন, গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে বাসার তৃতীয় তলার খোলা ছাদে হত্যা করা হয়। পরে পাশের বাড়ি থেকে যেন লাশ দেখা না যায়, সে জন্য মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির কাছে সরিয়ে রাখা হয়েছিল।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে গণপতির ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাসকে দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়। চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় রংপুর পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ের মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন কমিশনার আব্দুল মাবুদ।

ইয়াবা সেবন থেকে হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত

পুলিশ কমিশনার জানান, গ্রেপ্তার দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নিয়মিত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের জন্য যেতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। বাড়িটির ছাদে দেয়াল থাকায় পাশের বাড়ি থেকে সহজে দেখা যেত না। এ কারণে তাঁরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে মাদক সেবন করতেন।

সিদ্ধার্থের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আটটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, একসঙ্গে এত বেশি ইয়াবা সেবনের ঘটনা তাঁদের জীবনে আগে ঘটেনি।

ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান। তখন তিনি তাঁদের ধমক দিয়ে জানতে চান, এত সকালে সেখানে তাঁরা কী করছেন। পুলিশের ভাষ্য, এ সময় নিজেদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগার কথা চিন্তা করে দুই তরুণ তাঁকে আক্রমণ করেন। গলায় গামছা পেঁচিয়ে টান দিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

এরপর শব্দ পেয়ে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে চলে আসেন বলে তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, মুগ্ধ গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ তাঁর মেয়ের গলা ও মুখ চেপে ধরেন। পরে দুজন মিলে গামছা ও রশি ব্যবহার করে তাঁকে হত্যা করেন বলে পুলিশের ভাষ্য।

সিসিটিভি এড়াতে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন

হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়ির নিচতলায় নেমে আসেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। ছাদে পাওয়া একটি পুরোনো প্লাস ব্যবহার করে তাঁরা বিদ্যুতের তার কেটে দেন।

পুলিশের ধারণা, বাড়িতে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরা যাতে কাজ না করে, সে কারণেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পরে সিদ্ধার্থ আবার ছাদে গিয়ে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে গণপতির স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের গেটের ভেতরে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে রাখেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের বাড়ির ছাদ ছিল মাত্র দুই ফুট দূরে। সেখান থেকে যাতে মরদেহ দেখা না যায়, সে জন্য সেগুলো আড়ালে রাখা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে আয়ুশ

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এরপর দুই তরুণ গণপতি চক্রবর্তীর কক্ষে প্রবেশ করেন। ওই সময় তাঁর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়।

আয়ুশ তখন সিদ্ধার্থকে চিনতে পেরে জিজ্ঞাসা করে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য, শিশুটি তাদের দেখে ফেলায় এবং তার চিৎকার বা বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে কাপড় দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

তবে এ ঘটনায় পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন বক্তব্যের পার্থক্য রয়েছে।

শিশুকে হত্যার সময় নিয়ে পুলিশের বক্তব্য বদল

গত রোববার একই ঘটনায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানিয়েছিলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে ভোররাতে ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা হয়েছিল। সে সময় বলা হয়েছিল, ঘুমন্ত অবস্থাতেই শিশুটির ওপর হামলা চালানো হয়।

বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন কমিশনার। তিনি বলেন, আগেরবার গ্রেপ্তার দুই তরুণের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, সেটির ভিত্তিতেই ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটিকে হত্যার কথা বলা হয়েছিল। পরে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখেছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।

হত্যার কারণ নিয়েও নতুন তথ্য

হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার বিষয়টি ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তে নতুন দিক সামনে এসেছে।

এর আগে পুলিশ জানিয়েছিল, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ হত্যাকাণ্ড ঘটান। তবে বৃহস্পতিবার পুলিশ কমিশনার জানান, এর পাশাপাশি জমিজমা নিয়ে সিদ্ধার্থের পরিবারের পুরোনো অসন্তোষও হত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

সিদ্ধার্থের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, গণপতি চক্রবর্তীরা সিদ্ধার্থের পূর্বপুরুষের জমি কিনেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। জমিটি তুলনামূলক বেশি দামে কেনা হলেও সিদ্ধার্থের পরিবারের কয়েকজন শরিক তাঁদের প্রাপ্য অর্থ পাননি—এমন একটি অভিযোগ বা বিরোধের বিষয় তদন্তে এসেছে। এ কারণে সিদ্ধার্থের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিও তদন্তে

গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পর্কের ধরনও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাছুয়াপাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দা দাস বংশের এবং গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের। রাস্তাঘাটে দেখা-সাক্ষাৎ থাকলেও দুই পক্ষের মধ্যে বাড়িতে যাতায়াত বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। এই সামাজিক দূরত্ব কোনো ধরনের ক্ষোভ বা বিরোধ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

চারজনের মরদেহ উদ্ধার

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামাল কাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। একই পরিবারের চারজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

এ ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যার ঘটনাক্রম, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রশ্নের মুখে সংবাদ সম্মেলন

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের পর সাংবাদিকেরা পুলিশের আগের ও বর্তমান বক্তব্যের পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন করেন। তবে পুলিশ কমিশনার মাত্র দুটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন।

ফলে হত্যাকাণ্ডের সময়, স্থান এবং উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি সাংবাদিকেরা। এ নিয়ে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

চারজনকে একই পরিবারের সদস্যকে হত্যার ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হত্যার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং পুলিশের বয়ানে থাকা পার্থক্যগুলো পরিষ্কার করা। ইয়াবা সেবন, জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং ব্যক্তিগত বা সামাজিক ক্ষোভ—কোনটি কতটা ভূমিকা রেখেছে, তদন্ত শেষ হলে তারই স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category