ঢাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে চীনের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব এলাকায় আধুনিক আবাসন নির্মাণে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রস্তাব অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) মাধ্যমে চীনের কাছে দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নে চীনের পক্ষ থেকে সম্মতি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সংশ্লিষ্ট সচিব মো. শহিদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নগর আবাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পয়োনিষ্কাশন ও বন্দর উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
বস্তির জায়গায় বহুতল আবাসন
প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক এলাকায় পুনর্বাসনের জন্য যে আবাসন পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেখানে ২০ তলা ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। ছোট ছোট ইউনিটে তৈরি করা হবে ফ্ল্যাটগুলো।
পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পুনর্বাসিত বাসিন্দাদের কাছ থেকে ফ্ল্যাটের জন্য ভাড়া নেওয়া হবে না। তাঁদের শুধু গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনানুষ্ঠানিক ও ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করা পরিবারগুলো স্থায়ী ও পরিকল্পিত আবাসনের সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে এসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ বসবাস করছেন। নতুন আবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তাঁদের জীবনযাত্রার পরিবেশ, আবাসন নিরাপত্তা এবং নাগরিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনা বিনিয়োগ
বৈঠকে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চীনের বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বস্তি উন্নয়নের মতো বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘সিএমইসি’র মাধ্যমে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ প্রকল্পের চূড়ান্ত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি আগামী ২ সেপ্টেম্বর বেইজিংয়ে স্বাক্ষরের কথা রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ‘পাওয়ার চায়না’র সঙ্গে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দাশেরকান্দি প্রকল্পে অর্থায়নের আশ্বাস
ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নেও চীনের সহযোগিতার কথা জানানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দাশেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের বাকি কাজ শেষ করতে চীনের পক্ষ থেকে ঋণ অথবা অনুদানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার এসব ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্যকর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নগর ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সরকারি ভবনের ছাদেও সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও সহযোগিতার বিষয়ে চীনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি ভবন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে সরকারি স্থাপনাগুলোর বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মোংলা বন্দরের উন্নয়নেও সহযোগিতা
বৈঠকে মোংলা বন্দরের উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, মোংলা বন্দরের উন্নয়নে চীন কাজ করবে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দরের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি সংযোগ বা লিংকেজ তৈরির বিষয়েও চীনের পক্ষ থেকে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।
বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন দুই দেশের সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেছেন।
আবাসন থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরবিদ্যুৎ থেকে পয়োনিষ্কাশন এবং বন্দর উন্নয়ন—বিভিন্ন খাতে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার যে উদ্যোগগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি আসতে পারে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল পেতে প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন, বাস্তবায়ন ও সময়সীমা যথাযথভাবে অনুসরণ করাই হবে বড় বিষয়।