অনলাইনে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পদার্থ বিক্রির অভিযোগে একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে রাসায়নিক ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। সংস্থাটির গোয়েন্দা তৎপরতায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২৪ আগস্ট ঢাকার নিকেতন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড ও ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়। পরে কুড়িল প্রগতি সরণী এলাকায় ই-কেমের কার্যালয়েও অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে প্রতিষ্ঠানটির আইটি ম্যানেজার মো. আব্দুল মোমিন পাটোয়ারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠানে আরও রাসায়নিক পদার্থ এবং নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কাগজপত্র পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মালিকসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে এমন নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের অননুমোদিত সরবরাহ ঠেকাতে সম্প্রতি অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে নজরদারি বাড়ায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা ইউনিট। এর অংশ হিসেবে ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা দল সাইবার পেট্রোলিং চালানোর সময় অনলাইনে রাসায়নিক বিক্রির একটি তথ্য পায়।
তথ্য যাচাই করতে গিয়ে গোয়েন্দারা দেখতে পান, ই-কেম নামের একটি প্রতিষ্ঠান অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিক্রির বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডার নিচ্ছে। বিষয়টি আরও যাচাইয়ের সময় আগের একটি মামলার তদন্তের সূত্রও সামনে আসে। তখন নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকগুলোর বিক্রয়প্রক্রিয়া, ক্রেতার পরিচয় যাচাই এবং এসব পদার্থের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে তদন্তকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়।
গোয়েন্দা তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে ডিএনসির পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইডের অর্ডার দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্ডার নেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স কিংবা ব্যবহারের উদ্দেশ্যসংক্রান্ত কোনো নথি চাওয়া হয়নি। পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে অর্ডার করা পণ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অর্ডার করা পণ্য ঢাকার নিকেতন এলাকায় পৌঁছানোর পর সেখানে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা দল। ২৪ আগস্টের ওই অভিযানে সরবরাহ করা পার্সেল থেকে ৫০০ মিলিলিটার এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড এবং ১ লিটার এসিটোন জব্দ করা হয়।
অভিযানের সময় ডেলিভারিম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ই-কেমের কার্যালয় কুড়িল প্রগতি সরণী এলাকায়। এরপর সেখানে অভিযান চালানো হয়।
কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে মোট ৬ লিটার রাসায়নিক পদার্থ এবং নিয়ন্ত্রিত প্রিকারসর কেমিক্যাল বিক্রির কিছু কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। অভিযোগ রয়েছে, এসব রাসায়নিক বিক্রির সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়নি।
প্রিকারসর কেমিক্যাল এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ, যেগুলোর বৈধ শিল্প, গবেষণা বা বাণিজ্যিক ব্যবহার থাকতে পারে। কিন্তু একই পদার্থ অবৈধ মাদক তৈরির প্রক্রিয়াতেও ব্যবহৃত হতে পারে। এ কারণেই এগুলোর বিক্রি ও সরবরাহ সাধারণ রাসায়নিক পণ্যের মতো নয়; নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকা এসব পদার্থের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ধারা ২-এর উপধারা (১৯)-এ প্রিকারসর কেমিক্যালের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইনের তফসিলে এসব রাসায়নিকের তালিকাও রয়েছে। ফলে নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের বৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব বর্তায়।
এ ক্ষেত্রে এসিটিক এ্যানহাইড্রাইড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মরফিন থেকে হেরোইন উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হতে পারে। আবার এসিটোনসহ আরও কিছু রাসায়নিক অবৈধ মাদক উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। একই কারণে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট, ইথাইল ইথার, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, মিথাইল ইথাইল কিটোন ও টলুইনের মতো রাসায়নিকও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজরদারির আওতায় থাকে।
তবে এসব রাসায়নিকের সব ব্যবহার অবৈধ নয়। বিভিন্ন বৈধ শিল্প ও গবেষণাগারেও এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। মূল বিষয় হলো—বৈধ সরবরাহব্যবস্থার রাসায়নিক যেন অবৈধ মাদক উৎপাদনের কাজে চলে না যায়।
আগে মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরাসরি মাদক উদ্ধার, চোরাচালান এবং মাদক বিক্রির নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই বড় ধরনের কার্যক্রম ছিল। এখন প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মাদক তৈরির উপকরণ সংগ্রহের ডিজিটাল পথও নজরদারিতে আসছে।
অনলাইনে রাসায়নিকের বিজ্ঞাপন, অর্ডার গ্রহণ ও সরবরাহের সুযোগ থাকায় নিয়ন্ত্রিত পদার্থের ক্রেতা যাচাইয়ের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোনো রাসায়নিক নিয়ন্ত্রিত তালিকায় থাকলে সেটি কে কিনছেন, কী পরিমাণে কিনছেন এবং কোন কাজে ব্যবহার করবেন—এসব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, সাম্প্রতিক অভিযানে জব্দ করা রাসায়নিক, নথিপত্র ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হচ্ছে। তদন্তে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব রাসায়নিকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, ক্রেতা এবং সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রিকারসর কেমিক্যালের অপব্যবহার ঠেকানো শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে এসব রাসায়নিক অবৈধ মাদক উৎপাদনে চলে যাওয়া ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজরদারি ও তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা রয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করে।
বাংলাদেশেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় প্রিকারসর কেমিক্যাল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু পণ্য বিক্রি করেই শেষ হয় না। নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ক্ষেত্রে ক্রেতার পরিচয়, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং ব্যবহারের উদ্দেশ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক অভিযানের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মূলত মাদক তৈরির সম্ভাব্য সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের দিকে নজর দিয়েছে। তৈরি মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি এর কাঁচামাল কোথা থেকে আসছে, কীভাবে সংগ্রহ হচ্ছে এবং অনলাইন বাণিজ্যের কোনো সুযোগ ব্যবহার করে তা সরবরাহ করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও এখন তদন্তের অংশ।
ডিএনসি বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাইবার পেট্রোলিং ও অনলাইন নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক অভিযানের পর উদ্ধার হওয়া রাসায়নিক ও নথিপত্রের বিশ্লেষণ থেকে অনলাইনভিত্তিক এই সরবরাহব্যবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।