• বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৩ অপরাহ্ন

নির্মাণশ্রমিকের আশায় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলেন পঙ্গু হয়ে

newsline24 / ৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
নির্মাণশ্রমিকের আশায় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলেন পঙ্গু হয়ে
নির্মাণশ্রমিকের আশায় রাশিয়া, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলেন পঙ্গু হয়ে

অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের তরুণ রাজন হোসেন। বয়স মাত্র ২২ বছর। কথা ছিল নির্মাণশ্রমিকের কাজ করবেন, উপার্জন করে পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু বিদেশের মাটিতে গিয়ে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই বদলে যায় ভয়াবহ বাস্তবতায়। নির্মাণকাজের পরিবর্তে তাকে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন রাজন। কোমরের নিচ থেকে শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর জীবন বাঁচাতে চার দিন ধরে বুকের ওপর ভর করে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে পৌঁছান। দীর্ঘ চিকিৎসা ও নানা প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় গত ২১ আগস্ট দেশে ফেরেন তিনি।

রাজনের বর্ণনায়, রাশিয়ায় যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াতেই ছিল প্রতারণার অভিযোগ। তিনি জানান, গত ৭ মে বাংলাদেশ থেকে তাকে মস্কো নেওয়া হয়। সেখানে আরও ২৯ বাংলাদেশির সঙ্গে তাকে বাসে করে ওয়ারেনবার্গে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি হোটেলে তিন থেকে চার দিন রাখার পর ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে।

সেখানে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন রাজনসহ অন্যরা। নির্মাণকাজ নয়, তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালেও সেই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি।

পরে সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে তাদের একটি বাংকারে নেওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশিদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়। রাজন ছিলেন ছয়জনের একটি দলে। তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোশাক ও অস্ত্র দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে পাঠানো হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।

সেখানেই ঘটে জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা।

রাজন জানান, যুদ্ধের প্রথম দিন ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি নিহত হন। একই হামলায় একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করে। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, কোমরের নিচে আর কোনো শক্তি অনুভব করছেন না।

চারদিকে তখন মৃত্যু আর আতঙ্ক। মাথার ওপর ড্রোন, মাটির নিচে মাইনের ভয় এবং সামনে প্রতিপক্ষের সেনা—এই পরিস্থিতির মধ্যেই বাঁচার চেষ্টা করেন রাজন। কোনোভাবে বুকের ওপর ভর করে এগোতে থাকেন। এভাবে চার দিনে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে একটি হাসপাতালে আশ্রয় নেন।

রাজনের ভাষায়, ‘উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা—কী যে ভয়াবহ অবস্থা, তা বোঝানো যাবে না।’

পরে তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক চিকিৎসক তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান। দূতাবাসের সহযোগিতায় ট্রাভেল পাস সংগ্রহের পর ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সে করে ২১ আগস্ট দেশে ফেরেন তিনি।

দেশে ফিরে এখন রাজনের সামনে নতুন লড়াই—চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য উপার্জনের স্বপ্ন দেখা এই তরুণ এখন নিজেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

রাজনের বাবা আব্দুল কাদের জানান, ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য ধারদেনা করে একতারপুর গ্রামের লেন্টু হোসেনকে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। প্রায় তিন বছর অপেক্ষার পর নির্মাণশ্রমিকের কাজ দেওয়ার কথা বলে রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে যুদ্ধের মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।

এখন ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহন করাও পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। আব্দুল কাদের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

রাজনের মা মাহফুজ বেগমের কণ্ঠেও অসহায়ত্ব স্পষ্ট। তিনি বলেন, সংসারের অভাব দূর করার আশায় সুস্থ-সবল ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সেই ছেলে এখন আর হাঁটতে পারেন না। মানুষের সহায়তায় কোনোভাবে দিন কাটছে তাঁদের।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক মুসা করিমের মতে, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পাঠানোর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাজনের পরিবার দালালের মাধ্যমে সর্বস্বান্ত হয়েছে দাবি করে তিনি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ ওঠা দালাল আবু তাহের লেন্টু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তার ভাগ্নে সোহেলের মাধ্যমে রাজনকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। এতে কোনো প্রতারণা হয়নি এবং রাজনকে সরকারি প্রক্রিয়াতেই রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

রাজন অবশ্য জানিয়েছেন, জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।

এদিকে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা নাহিদ বলেছেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে দালালদের কথায় না গিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। প্রতারণা ঠেকাতে মানুষকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে রাশিয়া থেকে আহত হয়ে দেশে ফেরা রাজনের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে বলেও জানিয়েছেন ইউএনও।

রাজনের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের গল্প নয়। বিদেশে চাকরির আশায় যাওয়া একজন তরুণ কীভাবে প্রতিশ্রুত কাজের বদলে যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছে গেলেন, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে ঘটনাটি। এখন তাঁর পরিবারের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—উপযুক্ত চিকিৎসা, ক্ষতিপূরণ এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category