পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা কোনোভাবেই সফল হতে দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। তবে সেই দাবিকে পুঁজি করে কারখানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা পুলিশের ওপর হামলার মতো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।
সোমবার (২ নভেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। পোস্টে পোশাকশিল্পের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ এবং শিল্প খাতকে ঘিরে চলমান অস্থিরতার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগে দেশে এ শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এই খাতের বিকাশের মধ্য দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ ও স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষেত্রে পোশাকশিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও এ শিল্পের সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
উপদেষ্টা জানান, সেই ধারাবাহিকতায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি, মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকার কাজ করেছে। এর অংশ হিসেবে বিগত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও উৎসব বোনাস নির্ধারিত সময়ে পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
পোশাকশিল্পের সঙ্গে দেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জড়িত। এই শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানির ওপর নির্ভর করে দেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও ন্যায্য মজুরির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশিল্পের মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মালিক, শ্রমিক এবং নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে মজুরি পুনর্নির্ধারণের এই প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে উসকানি ও নাশকতার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রমিকদের ব্যবহার করে শিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরির এমন প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারখানায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর আক্রমণ কোনোভাবেই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করে না। বরং এসব কর্মকাণ্ডে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
মাহদী আমিনের মতে, একটি পোশাক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন সেখানে কর্মরত শ্রমিকেরা। নিয়মিত কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের আয় কমে যায়, পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট বাড়ে এবং নতুন করে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর প্রভাব শুধু একটি কারখানা বা নির্দিষ্ট কিছু শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সরবরাহব্যবস্থা, সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের সুযোগ যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে। সরকার শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আলোচনার পথ খোলা রেখেছে। কিন্তু সহিংসতা, নাশকতা কিংবা উৎপাদনব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পোশাকশ্রমিকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, কোনো ধরনের গুজব, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা কিংবা উসকানিতে প্রভাবিত হওয়া যাবে না। নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি পূরণে শ্রমবান্ধব সরকার সব সময় তাঁদের পাশে থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা রক্ষায় শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এবং মালিক-শ্রমিকের মধ্যে কার্যকর আলোচনার পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকদের অসন্তোষের কারণগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখাও জরুরি। কারণ, শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের স্থিতিশীলতা—দুটিই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।