নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুর) আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে দ্বিতীয় দফায় আরও দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে গুরুদাসপুর আমলি আদালতের বিচারক মাহমুদুল হাসান রিমান্ড শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
মামলার তদন্তের স্বার্থে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দ্বিতীয় দফায় সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিল। তবে শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তিনি ডিবি পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এর আগে প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ডে মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ভোর ৩টার দিকে আলামিন হোসেন (২৬) ও আনিসুর রহমানকে (২৫) আটক করা হয়। পরে তাঁদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার কারাগারে পাঠানো হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য কিংবা হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।
এর আগে বুধবার বিকেলে প্রথম দফায় মিন্টুকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সেই রিমান্ড শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁকে আদালতে নেওয়া হলে বিচারক সেদিন নতুন করে রিমান্ড শুনানি না করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে সোমবার সকালের নতুন আদেশ পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।
যেভাবে হামলার শিকার হন শাকিল
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। হেলমেট পরা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে তাঁর ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে হামলাকারীরা।
স্থানীয়রা আহত শাকিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। সেখানে টানা ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম গুরুদাসপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। ছেলের মৃত্যুর আগে দায়ের করা মামলাটিতে পরবর্তী সময়ে হত্যার অভিযোগ যুক্ত করে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
শাকিলের মৃত্যুর দিন রাত ১০টার দিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁকে প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। মামলাটির তদন্ত করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ।
এদিকে, শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর মিন্টুকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ড ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা
শাকিলের মৃত্যুর পর গুরুদাসপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গলবার তাঁর জানাজা শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাসেলের একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তবে ওই ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এসব ঘটনার পর সংসদ সদস্য আবদুল আজিজকে ঘিরেও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে বুধবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হলে বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
একই সময়ে শাকিল হত্যা মামলায় তাঁর ছেলের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ঘটনাও সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলে। আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে নাটোর জেলা বিএনপির নেতাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে জেলা কমিটির ভেতরে অসন্তোষ ও বিভক্তি তৈরি হয়।
আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে করণীয় নির্ধারণে জেলা বিএনপি দীর্ঘ আট ঘণ্টার বৈঠক করে। বৈঠকে শাকিল হত্যা মামলায় তাঁর ছেলে মিন্টুর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়ে আলোচনা হয়। নেতারা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এবং দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করেন।
বৈঠক শেষে জেলা বিএনপি সিদ্ধান্ত নেয়, আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার জেলা কমিটির নেই। তাই বিষয়টি কেন্দ্রীয় বিএনপিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, আবদুল আজিজ তাঁদের কাছে জেলার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং একজন সংসদ সদস্য। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা কমিটির কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই। এ কারণে সর্বসম্মতিক্রমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি দলের উচ্চপর্যায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিবারকে সমবেদনা, বিচারের আশ্বাস
এদিকে শাকিল হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা। বৃহস্পতিবার বিকেলে গুরুদাসপুর পৌরসভার খোয়ারপাড়া খামারনাচকৈড় এলাকায় নিহত শাকিলের বাড়িতে যান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব।
তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সমবেদনা জানান। অপরাধের সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, তাঁর পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনা না করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন তাঁরা।
শাকিল হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মিন্টুসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং এর পেছনের কারণ সম্পর্কে তদন্তের চূড়ান্ত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
দ্বিতীয় দফায় মিন্টুর দুই দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কী তথ্য পাওয়া যায়, অন্য গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর কী ধরনের যোগাযোগ ছিল এবং হত্যাকাণ্ডে কারা সরাসরি জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। শাকিলের পরিবার ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে এবং তাঁদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করা হবে।