কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় নাছিমা বেগম (৪২) নামে এক নারী নিহত হয়েছেন। পরিবারের অভিযোগ, জমি দখল করতে এসে তাঁকে চড়-থাপ্পড় ও মারধর করা হয়। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটেরও অভিযোগ উঠেছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) ভোর ৫টার দিকে উপজেলার সদকী ইউনিয়নের বাটিকামারা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলে নাসির হোসেন বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে কুমারখালী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
নিহত নাছিমা বেগম বাটিকামারা এলাকার ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে পুলিশ দুজনকে আটক করে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তাঁরা হলেন একই এলাকার মৃত সুপাইয়ের ছেলে মিঠু হোসেন (৪৮) এবং সুদে শেখের ছেলে রিপন শেখ। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বাটিকামারা মৌজার ১০৫ নম্বর দাগে প্রায় ২৫ শতাংশ জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। জমিটির ওপর নিহত নাছিমা, তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ও তাঁদের স্বজনদের মালিকানা দাবি রয়েছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা প্রায় ৪৩ বছর ধরে ওই জমিতে বসবাস করছেন।
সম্প্রতি একই এলাকার মৃত জনির উদ্দিনের তিন ছেলে মোমিন শেখ (৫৫), মামুন হোসেন (৫০) ও সেলিম হোসেন (৬০) জমিটির মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয় এবং আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় সোমবার ভোরে মোমিন শেখ ও তাঁর স্বজনেরা লোকজন নিয়ে নাছিমাদের বাড়িতে যান। সেখানে তাঁরা বাড়ির বেড়া ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে হামলা ও মালামাল লুটপাট শুরু করেন। পাশাপাশি বিরোধপূর্ণ জমিতে নতুন করে ঘর নির্মাণের কাজও শুরু করেন।
এ সময় নাছিমা বাধা দিতে গেলে তাঁকে চড়-থাপ্পড় ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে স্বজনেরা তাঁকে দ্রুত কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। তবে মারধরের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, নাকি অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা এর পেছনে ছিল, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাছিমার মা আলেয়া খাতুন মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সকালে মোমিন ও তাঁর লোকজন বাড়িতে এসে ভাঙচুর শুরু করেন। বেড়া ভেঙে ঘর নির্মাণের চেষ্টা চালান। এ সময় তাঁর মেয়ে বাধা দিতে গেলে ধাক্কা ও চড়-থাপ্পড় মারা হয়। এতে তাঁর মেয়ের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাছিমার স্বামী শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ঘটনার আগের রাতে মিঠু ফোন করে তাঁদের কাছে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। টাকা না দিলে বাড়িঘর ভাঙচুর করে জমি দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তাঁর। শহিদুলের অভিযোগ, পরদিন সকালে সেই হুমকি অনুযায়ী হামলা চালিয়ে জমি দখলের চেষ্টা করা হয় এবং তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করা হয়। তিনি এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন।
মামলার বাদী নাসির হোসেনের অভিযোগ, বিরোধপূর্ণ জমিতে মোমিনদের কোনো বৈধ মালিকানা নেই। তাঁরা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে জমির দাবি করছেন। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়ে তাঁর মাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশায় মামলা করেছেন বলে জানান নাসির।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মোমিন শেখকে তাঁর বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর স্ত্রী রহিমা খাতুন জমি দখলের চেষ্টার বিষয়টি স্বীকার করলেও নাছিমাকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, সকালে তাঁরা জমি দখল করতে গিয়েছিলেন। এ সময় বেড়া খোলার শব্দ শুনে নাছিমা স্ট্রোক করেন। তাঁরা তাঁকে মারধর করেননি।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে নাছিমা বেগমকে হত্যার অভিযোগে থানায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে।
ওসি আরও জানান, নাছিমার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
দীর্ঘদিনের জমি বিরোধ আদালতে বিচারাধীন থাকার মধ্যেই একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনা এলাকায় উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জমি দখলের চেষ্টা, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।