রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা, ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ ও সরকারি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে করা পৃথক তিন মামলায় ২৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম ও কালাম উদ্দিনের পৃথক আদালতে শুনানি শেষে এ আদেশ দেওয়া হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রফিকুল ইসলাম ও এসআই আবু বক্কর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, তিন মামলার মধ্যে পল্লবী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় ১৩ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। একই থানায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় করা অপর মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে সাতজনকে। অন্যদিকে, মিরপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় ছয়জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তিন মামলায় গ্রেপ্তার ২৬ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
কারাগারে পাঠানো ব্যক্তিরা হলেন মো. ওলিউল্লাহ অনিক (২০), মো. কামাল গাজী (৩২), আলিফ হোসেন ইমন (২৬), রমজান সরকার (১৯), মো. মহিম মোল্লা (১৯), জুবায়ের ইসলাম ওরফে জিসান (২২), মো. আরিফ আকন্দ (২৯), মোয়াজ্জেম শাহরিয়ার নিয়াজ (২৬), মো. আরিফ (১৯), মো. নাহিদ হাসান (১৮), মাহবুবুর রহমান জুয়েল (৩৮), শামীম (২৩), মো. সুমন গাজী (২৮), মো. ইউসুফ আলী (২২), রাজীব চন্দ্র দাশ (২৮), মো. জামাল সরকার (৩৩), মো. তারেক হোসেন (২৪), মো. ইমরান হোসেন (৩০), মো. আবুল কাসেম (২২), মো. মহীন উদ্দিন (২৩), কাওসার আহমেদ (২২), মো. রফিক গাজী (২১), মো. ইসমাইল (২০), মো. সাইফুল ইসলাম (২৬), মো. সজীব শেখ (২০) এবং মো. মোর্শেদ আলম (২৫)।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১ নভেম্বর পল্লবী থানার মিরপুর-১২ এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলাকালে একপর্যায়ে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই সময় এলাকায় প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি বিক্ষোভে অংশ নেন।
পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পুলিশের একটি সরকারি পিকআপে আগুন দেয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে ককটেলের বিস্ফোরিত অংশ এবং পেট্রলভর্তি দুটি প্লাস্টিকের বোতল জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, মিরপুর মডেল থানার মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর সকাল ৮টার দিকে মিরপুর-১০ গোলচত্বরে শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার ঘটনা ঘটে। অন্তত চারটি পোশাক কারখানাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার প্রায় তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক সেখানে সমবেত হন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল মাসিক ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ।
শ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বেতনসংক্রান্ত দাবি পর্যালোচনার জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়টি জানিয়ে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়।
তবে অভিযোগে বলা হয়েছে, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরে মিরপুর-১০ এলাকার একটি ট্রাফিক পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এ সময় ইটপাটকেলের আঘাতে দায়িত্ব পালনরত নারী পুলিশ সদস্য সামিয়া আহত হন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কারাগারে রাখার আবেদনেও তদন্তের অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা। আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে আত্মগোপন করতে পারেন এবং তদন্তের কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ কারণে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাদের কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মিরপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতার অভিযোগ—সবকিছুই এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে। তিন মামলার তদন্তে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।