আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া ২৬৪টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের চেষ্টা ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আশুলিয়ার পিকার্ড বাংলাদেশ, জনরন সোয়েটার, ফেরারী গার্মেন্টস, ডেনিটেক্স, আনলিমা টেক্সটাইল, আল ইসলাম টেক্সটাইল ও জি.কিউ. ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সামনে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ ছাড়া আর্টিস্টিক ডিজাইন লিমিটেড কারখানার সামনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে একটি কাভার্ড ভ্যানেও আগুন দেওয়া হয়।
সকাল থেকে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের সঙ্গে তাঁদের একাধিকবার সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে শিল্প পুলিশ জানিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কার্যক্রম ও যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
বিক্ষোভে বহিরাগতদের অংশগ্রহণের অভিযোগ
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের এসপি মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনে বহিরাগত ও দুষ্কৃতকারীরা যোগ দিয়েছেন বলে তাঁদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও আটকের চেষ্টা চলছে। তবে সোমবার পর্যন্ত এ ঘটনায় শিল্প পুলিশ কাউকে আটক করেনি।
শিল্পাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাব্যবস্থা বহাল থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশের সদস্যরাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের সঙ্গে কাজ করছেন। শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও যানবাহনে হামলার ঘটনা ঠেকানোর পাশাপাশি যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলন
পোশাকশ্রমিকদের চলমান অসন্তোষের মূল কারণ ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি। কয়েক দিন ধরে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে এ দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাড়িভাড়াসহ দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করতে হবে।
আশুলিয়ার পাশাপাশি গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে টানা চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন পোশাকশ্রমিকেরা।
সোমবার সকাল থেকে চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি ও সফিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকায় যাত্রী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করেন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার শিবু মার্কেট এলাকায় সড়কে অবস্থান নিয়ে তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ওই সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়।
গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করেছে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলায় ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
সোমবার সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে এ তথ্য জানা যায়। জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা গেছে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যাতে নতুন করে সহিংসতা বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
মিরপুরেও সংঘর্ষ, কারখানায় ছুটি ঘোষণা
এর আগে রোববার রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মিরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের একাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পে এমন অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন সূচি, পণ্য সরবরাহ এবং রপ্তানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন
শ্রমিকদের অসন্তোষ নিরসনে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘোষণা দেন।
এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে এবং শনিবার তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন—
মালিকপক্ষের প্রতিনিধি: বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম শামছুদ্দিন।
শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি: বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের প্রতিনিধি: যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব।
নিরপেক্ষ সদস্য: মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও আনোয়ার হোসাইন।
এই বোর্ড পোশাকশিল্পের বিভিন্ন পদে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নতুন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করবে এবং তা গেজেট আকারে প্রকাশ করবে।
মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। ফলে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
সর্বশেষ মজুরি কাঠামো কার্যকর হয় ২০২৩ সালে
তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শ্রমিকদের নিম্নতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। পরের মাস অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে শ্রমিকেরা বর্ধিত মজুরি পেতে শুরু করেন।
সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হতো। তবে গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে শ্রম আইন সংশোধন বিল পাসের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
সেই হিসাবে চলতি বছরের নভেম্বর মাসে নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল। এর আগেই শ্রমিকদের আন্দোলন ও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন বোর্ড গঠন করেছে।
এখন নতুন মজুরি বোর্ডের সুপারিশে শ্রমিকদের প্রত্যাশা কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই মূল বিষয়। কারণ শুধু বোর্ড গঠন নয়, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নের সময়সীমা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা, শ্রমিকদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং কারখানার উৎপাদন সচল রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।