সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে মিরপুর মডেল ও পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) এসব তথ্য জানিয়েছেন।
মিরপুর মডেল থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান জানান, পুলিশের ওপর হামলা এবং ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নতুন করে আরও কয়েকজনকে আটক করা হলেও তাঁদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ভিডিও ফুটেজের ভিত্তিতে গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে, পল্লবী থানার ওসি জালাল উদ্দিন বলেন, পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া, পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা এবং ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের অভিযোগে তাঁর থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। সব কটি মামলার বাদী পুলিশ। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আন্দোলনে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ
গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাবি, পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলা আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে মিরপুরে সহিংসতা ও নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করেছিলেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী। তাঁদের একটি অংশ অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংগঠিত হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ডিবির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ১১ জন নেতাকর্মী রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিক নন বলে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে এসে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার উদ্দেশ্যে তাঁরা মিরপুরে জড়ো হয়েছিলেন বলে গোয়েন্দা পুলিশের ভাষ্য।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, সাধারণ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
সোমবারও সড়কে নামার চেষ্টা, টিয়ারশেল নিক্ষেপ
টানা দুই দিনের সংঘর্ষের পর সোমবার সকাল থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যেই কয়েক দফায় সড়কে নামার চেষ্টা করেন পোশাকশ্রমিকদের বিভিন্ন দল।
সকাল পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকার একটি গলি দিয়ে শ্রমিকরা সড়কে নামার চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দেয়। এ সময় কয়েকটি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়।
এরপর মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশের প্রশিকা মোড় এলাকাতেও শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পুলিশ তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রূপনগর এলাকা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ছোট ছোট দলে শ্রমিকরা মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে প্রশিকা মোড়ের দিকে আসছিলেন। তাঁরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে বেলা ১১টার দিকে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সকাল থেকেই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। সেখানে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যানবাহন ও জলকামান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
তবে বেলা সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মিরপুর-১০ নম্বর ও আশপাশের প্রধান সড়কগুলোতে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সাধারণ মানুষ ও পথচারীদের চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা যায়নি।
সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে সোমবার সকালে সচিবালয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা তৈরিতে কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন।
তাঁদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজ, অডিও রেকর্ড এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। আগের দিনও কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষ শ্রমিক আন্দোলনকে ব্যবহার করে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে জড়িতদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকৃত শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতা নিজের কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানার ক্ষতি চান না। সাম্প্রতিক অস্থিরতার সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে সরকার মনে করে। তবে কোনো শ্রমিক সংগঠনের নেতা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁকেও এসব কার্যক্রম থেকে সরে আসার আহ্বান জানান তিনি।
৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে দুই দিনের বিক্ষোভ
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত শনিবার থেকে মিরপুরে বিক্ষোভ শুরু হয়। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিলে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও মিরপুর-১২ নম্বরসহ আশপাশের এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়।
পরদিন রোববারও একই দাবিতে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে অবস্থান নেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিক। সকাল ৮টার দিকে শুরু হওয়া অবরোধের কারণে আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বেলা সোয়া ১১টার দিকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিপেটা, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। অন্যদিকে শ্রমিকদের বিভিন্ন দল পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে।
একপর্যায়ে দুপুরের দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। বেলা ১১টা ৩৮ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত স্টেশনগুলোতে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দুই দিনে সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় মিরপুরের জনজীবন ও পোশাকশিল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত দাবির বিষয়টি, অন্যদিকে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি এখন আলোচনায় রয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত ও গ্রেফতার অভিযান কতদূর এগোয়, তার ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতির অনেকটা নির্ভর করছে।