জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের সতর্কতার মধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসনকে ‘স্বেচ্ছামূলক’ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) উত্তর-পশ্চিম মালয়েশিয়ার লুমুত নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে কয়েক ডজন বাস এসে পৌঁছায়। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধের কারণে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোহিঙ্গাদের লুমুত নৌঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে জাহাজে করে তাদের মিয়ানমারে পাঠানো হবে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ ও একটি হাসপাতাল জাহাজ ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে মিয়ানমারের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে। দেশটির রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয় নিয়েও রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক সামরিক অভিযান ও সহিংসতার পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। মালয়েশিয়াতেও ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।
মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মানতে অস্বীকার করে আসছে। তাদের অনেক ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ বা বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে প্রত্যাবাসনের পর তাদের নাগরিকত্ব, বসবাসের অধিকার এবং নিরাপত্তা—সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর স্পষ্ট করেছে, রোহিঙ্গাদের এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে তারা যুক্ত নয়। সংস্থাটির মতে, মিয়ানমারে এখনো এমন পরিবেশ তৈরি হয়নি, যেখানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব।
রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরাও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন। আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (এআরএনসি) সহসভাপতি নে সান লুইনের দাবি, রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে রোহিঙ্গারা এখনো নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘাতের মাঝখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নতুন করে সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কক্সবাজারভিত্তিক ‘সেন্টার অব রোহিঙ্গা ক্রাইসিস স্টাডিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান রো মায়্যু ইসলামও প্রত্যাবাসনের আগে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, শুধু একটি দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর করলেই রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে না।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বন্ধের দাবি জানিয়েছে ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’ (এমএসএফ)-সহ ১৬০টিরও বেশি নাগরিক সমাজ সংগঠন। তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে রোহিঙ্গারা নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে পারেন।
সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করা হয়েছে, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের ঝুঁকিও থাকতে পারে। বিশেষ করে রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত থাকায় প্রত্যাবাসনের পর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে কয়েকজন অধিকারকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আশঙ্কা করেছেন, প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ না দিয়ে অস্থায়ী বাস্তুচ্যুতদের ক্যাম্পে রাখা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো মালয়েশিয়া বা মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, কোনো ব্যক্তির জীবন হুমকির মুখে থাকলে তাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে না। অর্থাৎ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন ব্যক্তির নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই পরিচালিত হবে।
গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত করতে তিনি মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে এই উদ্যোগের সঙ্গে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অবস্থানের স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। মালয়েশিয়া যেখানে প্রত্যাবাসনকে স্বেচ্ছামূলক হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলছে—মিয়ানমারে নিরাপদে বসবাসের বাস্তব পরিবেশ তৈরি হয়েছে কি না।
মালয়েশিয়া ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। ফলে দেশটিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক শরণার্থী মর্যাদার আইনি সুরক্ষা পান না। এই পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান অনেকটাই দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গাদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি বাড়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত কতটা নিরাপদ ও টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে মিয়ানমারে তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজ ভূমিতে বসবাসের অধিকার কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে তার ওপর। বর্তমানে এসব বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।