সম্প্রতি কোরীয় উপদ্বীপের সেনামুক্ত অঞ্চলে (ডিএমজেড) মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে উল্টো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন। শনিবার ভোরে দেশটির পূর্ব উপকূলীয় শহর ওনসান থেকে এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয়, যা অন্তত ৭০০ কিলোমিটার আকাশপথ পাড়ি দিয়ে পূর্ব সাগরে (জাপান সাগর) গিয়ে পড়ে।
দুই কোরিয়াকে বিভক্ত করে রাখা ডিমিলিটারাইজড জোন বা সেনামুক্ত অঞ্চলে ওই শক্তিশালী মাইন বিস্ফোরণে টহলরত দক্ষিণ কোরিয়ার তিন সামরিক সদস্য গুরুতর আহত হন। সিউলের সামরিক বাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ কমান্ড প্রাথমিক তদন্ত শেষে দাবি করে যে, এই বিস্ফোরণের পেছনে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি হাত রয়েছে এবং তারাই গোপনে সেখানে মাইনগুলো পুঁতে রেখেছিল। এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পিয়ংইয়ংকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানায় সিউল। ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার প্রশস্ত এই সীমান্তবর্তী বাফার জোনটিতে এমনিতেই বিপুলসংখ্যক স্থলমাইন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে নতুন করে মাইন পোঁতার বিষয়টি সিউলকে দারুণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার এমন অভিযোগ প্রথম থেকেই পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছে পিয়ংইয়ং। উত্তর কোরিয়ার দাবি, ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে তাদের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা নেই। শুক্রবার কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং দক্ষিণ কোরিয়ার এই অভিযোগকে সরাসরি ‘ঘৃণ্য’ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ক্ষমা চাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এর ঠিক পরদিনই শনিবার সকালে তাদের এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনাটি ঘটল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পিয়ংইয়ং মূলত নিজেদের সামরিক শক্তির আস্ফালন দেখাচ্ছে। সিউলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানান, দক্ষিণ কোরিয়া যেখানে উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজছে, সেখানে উত্তর কোরিয়া বারবার উসকানিমূলক কাজ করে সংঘাতের দিকেই এগোচ্ছে। এই ঘটনার পর নতুন করে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় জরুরি বৈঠক ডেকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে এবং সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, প্রতিবেশী দেশ জাপানও এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পরবর্তী করণীয় ঠিক করছে সিউল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে পিয়ংইয়ং তাদের সমরাস্ত্র পরীক্ষা বাড়িয়ে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছে। উত্তর কোরিয়া প্রায়শই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে এ ধরনের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে থাকে। তাদের দাবি, এগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক। তবে পশ্চিমা বিশ্ব এবং প্রতিবেশী দেশগুলো এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। আপাতত সিউল এবং পিয়ংইয়ং উভয়েই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় এই অঞ্চলে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।