ইউক্রেনের সঙ্গে দূরপাল্লার হামলা বন্ধে কোনো যুদ্ধবিরতিতে যেতে রাজি নন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বরং মস্কো কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে আকাশ হামলা আরও জোরদার করেছে। একই সময়ে রাশিয়ার বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে পশ্চিমা কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। ১ অক্টোবর মস্কোয় ভলদাই ডিসকাশন ক্লাবের রাজনৈতিক ফোরামে এসব কথা বলেন পুতিন।
পুতিন বলেন, ইউক্রেন যদি রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করে, বিনিময়ে রাশিয়াও ইউক্রেনের জাহাজে হামলা বন্ধ করবে—এমন প্রস্তাবকে তিনি ‘হাস্যকর’ মনে করেন। ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের পর এ বিষয়টি সামনে আসে। ওই বৈঠকে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করলে কিয়েভও রুশ তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত।
পুতিনের দাবি, রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের হামলা কিছুটা কার্যকর হয়েছে এবং এতে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মস্কো এখন এর পাল্টা জবাব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের ইস্পাতশিল্প, সরবরাহব্যবস্থা এবং বিশেষ করে রেল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
এদিকে ১ অক্টোবর কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলায় একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। হামলার সময় শিক্ষার্থী ও কর্মীরা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকায় ওই ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে রাজধানীতে একের পর এক বিমান হামলার সতর্কতা জারি ছিল।
যুদ্ধবিরতির বিষয়ে অনাগ্রহ দেখালেও পুতিন দাবি করেছেন, আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন সংঘাতের অবসানেই রাশিয়ার আগ্রহ বেশি। যুদ্ধ শেষ হলে ইউক্রেনকে একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় মস্কো।
ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ন্যাটোর সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়ছে। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মাঝখানে বাল্টিক সাগরের তীরে অবস্থিত রাশিয়ার বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড কালিনিনগ্রাদ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন পুতিন। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়ার ভূখণ্ডে সরাসরি হামলার পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশটির হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিবেচনায় আসবে। এর মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রও রয়েছে।
পুতিনের এই বক্তব্যের আগে রাশিয়া ন্যাটোর কাছে একটি কূটনৈতিক নোট পাঠায়। এতে মস্কো অভিযোগ করেছে, ন্যাটো কালিনিনগ্রাদকে বিচ্ছিন্ন করতে বাল্টিক অঞ্চলে আকাশ ও নৌ অবরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাশিয়া সতর্ক করেছে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে রাশিয়ার পারমাণবিক হুমকিকে অপ্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেছেন এবং জোটটি নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
পুতিন আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাতে পাল্টাপাল্টি উত্তেজনা বাড়তে থাকলে এমন এক পর্যায় আসতে পারে, যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। তাঁর মতে, ক্রমাগত কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ধারা একসময় এমন একটি বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হবে।
অন্যদিকে, সম্পর্কের পরিস্থিতি অনুকূলে এলে রাশিয়ায় জব্দ করা পশ্চিমা কোম্পানির সম্পদ ভবিষ্যতে ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন পুতিন। সম্প্রতি রাশিয়া কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের নেসলে, ফ্রান্সের ওশাঁ ও লেরয় মার্লিন এবং জার্মানির মেট্রোর ব্যবসা ও সম্পদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পুতিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূলে গেলে এসব সম্পদ ফেরত দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
একদিকে ইউক্রেনে হামলা অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহের কথা বলা—পুতিনের সাম্প্রতিক বক্তব্যে এই দুই অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে কালিনিনগ্রাদকে কেন্দ্র করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুঁশিয়ারি রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যকার উত্তেজনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে।