ভারতের জ্বালানি তেল আমদানিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মধ্যে নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে রাশিয়া। ভারতের কাছে রুশ তেল বিক্রি বন্ধ বা সীমিত করতে পশ্চিমা বিশ্বের চাপ ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছে মস্কো।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) টাইমস নাউ-এর এক প্রতিবেদনে দিল্লিতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভের বক্তব্য তুলে ধরে এ তথ্য জানানো হয়।
এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেনিস আলিপভ বলেন, ভারতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করতে প্রস্তুত রাশিয়া। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, পশ্চিমা চাপের মুখেও ভারত-রাশিয়া জ্বালানি বাণিজ্য চালিয়ে যেতে আগ্রহী মস্কো।
রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, তেল বাণিজ্যে সৎ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, ভারতের জন্য রাশিয়ার তুলনায় আরও ভালো কোনো তেলের বিকল্প প্রস্তাব দিতে না পেরেই কিছু দেশ চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিচ্ছে।
ভারতের রুশ তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য কঠোর পদক্ষেপের আলোচনাও এ পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাবিত একটি খসড়া বিলের মাধ্যমে রুশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ ক্রেতা এবং রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এমন উদ্যোগ কার্যকর হলে ভারতের মতো বড় ক্রেতা দেশের জন্য রুশ জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে পশ্চিমা চাপের মধ্যেও রাশিয়া ভারতের অন্যতম প্রধান অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ভারত প্রতিদিন গড়ে ২১ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এই পরিমাণ ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৪৫ শতাংশ।
যদিও আগস্টের আমদানি জুলাইয়ের তুলনায় কমেছে। জুলাইয়ে ভারত প্রতিদিন প্রায় ২৮ লাখ ব্যারেল রুশ তেল আমদানি করেছিল। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক আমদানি প্রায় ৭ লাখ ব্যারেল কমেছে। তারপরও আগস্টে রাশিয়াই ভারতের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী ছিল।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের পরিশোধনাগারগুলোতে বিভিন্ন উৎস থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও করা হয়। ফলে তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে অপরিশোধিত তেল পাওয়ার বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেই সময় থেকে ভারত ও চীনসহ এশিয়ার দেশগুলো রুশ জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে ওঠে। ভারতের জন্য রুশ তেলের অন্যতম আকর্ষণ ছিল তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক দামে সরবরাহ পাওয়ার সুযোগ।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই দেশের জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন একটি দিকও তৈরি হয়েছে। রাশিয়া যেখানে ভারতের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কিনছে, সেখানে এবার ভারত থেকেই পরিশোধিত পেট্রোল আমদানি করেছে মস্কো।
শিপ ট্র্যাকিং উপাত্ত অনুযায়ী, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতি সামাল দিতে ২০২৬ সালের জুন ও জুলাইয়ে ভারত থেকে প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল পেট্রোল রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে। দুই দেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি বাণিজ্যের ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে একদিকে ভারতের রুশ তেল আমদানিকে ঘিরে পশ্চিমা চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি বাণিজ্যে মস্কো-নয়াদিল্লির পারস্পরিক নির্ভরতার নতুন দিকও সামনে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত কীভাবে রুশ জ্বালানি আমদানি, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এবং নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।