ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) উপপরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর আগে এ ঘটনায় জহিরুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ফলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে সব আসামির নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে র্যাবের পক্ষ থেকে সোমবার সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।
শনিবার রাতের ওই ঘটনার পর রোববার সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত এসআই আলতাফ হোসেনের স্ত্রী শিউলি বেগম। মামলায় মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে জহিরুল ইসলামসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে। বাকি ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার রাত আনুমানিক সোয়া ৮টার দিকে আমিনবাজারের চিশতিয়া পেট্রোল পাম্পের ভেতরের দিকে মদিনা সিটি এলাকায় একটি সাদা প্রাইভেটকার যায়। সেখানে অটোরিকশা রাখাকে কেন্দ্র করে চালক জহিরুল ইসলামের সঙ্গে অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিনের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে জহিরুল জসিমকে মারধর করেন। গ্যারেজের মালিক আবুল কালাম আজাদ বাধা দিতে গেলে তাঁকেও মারধর করা হয়।
সে সময় ওই পথ দিয়ে মসজিদে যাচ্ছিলেন এসআই আলতাফ হোসেন। মারধরের কারণ জানতে এগিয়ে গিয়ে তিনি নিজের পরিচয় দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর হামলাকারীরা তাঁকেও মারধর শুরু করে।
পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে আলতাফ হোসেন দৌড়ে কাছেই তাঁর দুই ছেলে শরিফুল ইসলাম ও আরিফুল ইসলামের পোশাক কারখানায় আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, এরপর জহিরুল ফোন করে পাশের বালুর মাঠ এলাকা থেকে আপন, জিহাদ ও আলাউদ্দিনসহ আরও ২০ থেকে ৩০ জনকে ডেকে আনেন। তাঁরা কারখানায় ঢুকে ভাঙচুরের পাশাপাশি আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামকে মারধর করেন।
হামলায় আলতাফের মাথায় ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যান। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার পর রাত ১০টার দিকে গুরুতর আহত বাবা ও ছেলেকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করেন।
তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলামও গুরুতর আহত অবস্থায় একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও হামলার শিকার গ্যারেজ মালিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, আলতাফ হোসেন তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন। পরে হামলাকারীদের আক্রমণের শিকার হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আবুল কালাম এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিহতের বড় ছেলে শরিফুল ইসলাম জানান, শনিবার ছুটির দিন থাকায় তাঁর বাবা বাসায় ছিলেন। পরে তিনি কারখানায় যান এবং সেখানেই হামলার শিকার হন।
শরিফুলের দাবি, তাঁদের কারখানার সামনে একটি সাদা প্রাইভেটকার প্রায়ই দেখা যেত। গাড়িটিতে চালকসহ কয়েকজন থাকতেন এবং কারখানার পাশে বালু ফেলে তৈরি হওয়া খোলা জায়গায় নিয়মিত মাদক সেবন করতেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। তাঁর ধারণা, ওই ব্যক্তিদের সঙ্গেই ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে।
নিহত আলতাফ হোসেন ঢাকার মালিবাগে এসবি কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার রূপনাই গাছপাড়া গ্রামে। পরিবার নিয়ে তিনি সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।
রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভিন। তিনি জানান, ঘটনার মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত জহিরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে। ঘটনার সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকলেও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি জানান।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। মামলায় নাম থাকা আসামিদের পাশাপাশি অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদেরও তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে ঘটনার পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।