রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে জাপান। একই সঙ্গে সংকট নিরসনে দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি বহুপক্ষীয় প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ আশ্বাস দেন মিয়ানমারে ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশনবিষয়ক জাপান সরকারের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া। সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের শুরুতে সাসাকাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। সাসাকাওয়া জানান, প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসনে কাজ করছেন। মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলন বা ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ায় জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তার দায়িত্ব ও ভূমিকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে উল্লেখ করে জাপানের বিশেষ দূত বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাপান সরকারের দেওয়া বিভিন্ন অনুদান ও মানবিক সহযোগিতার কথাও তিনি বৈঠকে তুলে ধরেন।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ সফরের জন্য সাসাকাওয়াকে ধন্যবাদ জানান এবং দীর্ঘদিনের মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয় দেওয়ার কারণে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এমনিতেই একটি জনবহুল দেশ। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকটের কারণে শুধু মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেই নয়, দেশের সামগ্রিক সম্পদ ও ব্যবস্থাপনার ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নিজের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখার জন্য জাপানের বিশেষ দূতের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের পর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠকে সাসাকাওয়া জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তিনি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তার মতে, সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকার আন্তরিক। তবে রাখাইন প্রদেশের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি অর্জনে আরও সময় লাগতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করতে আগ্রহী। নিজ দেশে ফিরে যেতে পারলে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মৌলিক সেবার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ সময় জাপানের বিশেষ দূত প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে তিনি তার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্বও বৈঠকে উঠে আসে।
দুই পক্ষের আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর না করে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ আরও কার্যকর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা করেন তারা।
বৈঠকে বাংলাদেশে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতার জন্য জাপানের বিশেষ দূতের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে সাসাকাওয়া আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ জাপানের বিনিয়োগ পেতে আগ্রহী এবং দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দিকের পাশাপাশি প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পায়। বিশেষ দূতের আশ্বাসের মধ্য দিয়ে সংকট সমাধানে জাপানের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।