ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে হুতিদের স্থল অভিযানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৮১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সরকারি বাহিনীর ৩৯ সদস্য এবং ৪২ জন হুতি যোদ্ধা রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে এএফপি।
ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় সংঘাতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। সরকারি বাহিনীর এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে সংঘর্ষে তাদের ২৪ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া তায়েজ এলাকায় আরও ১৫ সরকারি সেনা নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, লড়াইয়ে অন্তত ৪২ হুতি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাব আল-মান্দাব প্রণালি। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এর আশপাশের স্থলভাগ বা নৌপথে কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এই কৌশলগত গুরুত্বের কারণেই বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হুতিদের সামরিক তৎপরতা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রকেট ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি প্রণালির দক্ষিণ উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখলে নিতে স্থল অভিযান চালাচ্ছে হুতিরা।
হুতিদের লক্ষ্য শুধু উপকূলীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া নয়। এএফপির সামরিক সূত্রগুলোর বরাতে বলা হয়েছে, সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বন্দরনগরী মোখাকে বিচ্ছিন্ন করাও তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। শহরটি কয়েক সপ্তাহ ধরে হামলার মুখে রয়েছে।
হুতিরা মোখাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে পরবর্তী সময়ে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকাগুলোর দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য প্রণালি ও মোখাকে ঘিরে থাকা পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
ইয়েমেনের এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরবের নির্দেশে এডেন থেকে তায়েজে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো হয়েছে। সরকারি বাহিনীও বাব আল-মান্দাব ও মোখা এলাকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার আগে বাব আল-মান্দাব ও মোখাকে ঘিরে থাকা পাহাড়ি এলাকাগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে হুতিরা। ফলে সামনের দিনগুলোতে ওই অঞ্চলে লড়াই আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইয়েমেনে এই সংঘাত এমন এক সময়ে নতুন করে জোরালো হলো, যখন পশ্চিম এশিয়ার সামরিক উত্তেজনা ইতিমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান অচলাবস্থার প্রভাবের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনাও আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
এর মধ্যেই হুতিরা বাব আল-মান্দাবকে সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তারা বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে অবরোধের হুমকিও দিয়েছে তারা।
ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন শুধু স্থলযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথেও পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাব আল-মান্দাবের আশপাশে সামরিক সংঘাত বাড়তে থাকলে ওই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক পরিবহন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মোখা, বাব আল-মান্দাব ও সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকাগুলোই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সরকারি বাহিনী সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে, আর হুতিরা কৌশলগত অবস্থানগুলো দখলে নিয়ে উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন করে আরও জটিল সামরিক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে।