জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেন কয়েক হাজার মানুষ। এ সময় হলিউড তারকা, মানবাধিকারকর্মী, লেখক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ শতাধিক মানুষকে আটক করে নিউইয়র্ক পুলিশ।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ইহুদি, ফিলিস্তিনি, ইরানি ও লেবানিজ বংশোদ্ভূত নিউইয়র্কবাসীও ছিলেন। তাদের অনেকের টি-শার্টে লেখা ছিল ‘বোমা নয়, মানুষের পেছনে অর্থ ব্যয় করুন’। কেউ কেউ ‘গাজাকে বাঁচতে দাও’, ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ এবং ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা এক ঘণ্টারও বেশি সময় সড়কে অবস্থান নেন। এতে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দিকে যাতায়াতকারী সরকারি গাড়িগুলোকে বিকল্প পথে চলতে হয়। পরে পুলিশ তাদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ অমান্য করে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ায় কয়েকজনকে আটক করা হয়।
বিক্ষোভে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও নানা কর্মসূচি দেখা যায়। ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ লেখা ঘুড়ি ওড়ান বিক্ষোভকারীরা। আয়োজকদের ভাষ্য, চলতি বছরের শুরুতে ফিলিস্তিনি শিশুদের ঘুড়ি ওড়ানো নিয়েও ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়।
বিক্ষোভের সমন্বয়কারী সংগঠন ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস অ্যাকশন’-এর রাজনৈতিক পরিচালক বেথ মিলার বলেন, গত তিন বছরে গাজায় ৭৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। তার বক্তব্য, যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে নিউইয়র্কে স্বাগত জানাতে শহরের মানুষ আগ্রহী নয়।
আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুজান সারান্ডন, অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার, ডেবরা উইঙ্গার, মডেল ও অভিনেত্রী ইন্ডিয়া মুর, হুইসেলব্লোয়ার চেলসি ম্যানিং, কমেডিয়ান ক্যালেব হিরন, লেখক গ্লেনন ডয়েল ও ডেভিড ভ্যালেস্কো। এ ছাড়া র্যাবাই অ্যাবি স্টেইন এবং মানবাধিকারকর্মী লিন্ডা সারসুরও পুলিশের হাতে আটক হন।
আটকের আগে হান্না আইনবাইন্ডার বলেন, একজন ইহুদি, আমেরিকান ও মানুষ হিসেবে এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তার নৈতিক দায়িত্ব। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
পরে ব্রায়ান্ট পার্ক থেকে কয়েক হাজার মানুষের আরেকটি মিছিল জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দিকে এগিয়ে যায়। মিছিল থেকে ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানানো হয়। এর আগের দিন জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ইসরায়েলি বাহিনীর জন্য বাণিজ্যিক বিমানে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাঠানোর অভিযোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছিল।
বৃহস্পতিবারের কর্মসূচিতে ফিলিস্তিনপন্থী কয়েকজন রাজনীতিক ও নির্বাচিত প্রতিনিধিও অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্র্যাড ল্যান্ডার, দারিয়ালিজা আভিলা শ্যভালিয়ের, ক্রিস র্যাব, অ্যাডাম হামাউই ও মেলাত কিরোস। নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য চি ওসে, টিফানি কাবান, কংগ্রেস প্রার্থী শ্যভালিয়ের এবং আবের কাওয়াসসহ অন্তত ১০ জন জনপ্রতিনিধি ও প্রার্থীও আটক হন।
ফিলিস্তিনি ইয়ুথ মুভমেন্টের নাস ইসা অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং যুদ্ধের নীতি তুলে ধরার জন্য ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির অবস্থানও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও মামদানি চলতি বছরের শুরুতে স্বীকার করেন, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করার আইনি এখতিয়ার নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের নেই। এ ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
বৃহস্পতিবারের আটকের বিষয়ে মেয়রের দপ্তর তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে এর আগে মামদানি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী নিউইয়র্কবাসীর বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং তার প্রশাসন সেই অধিকারকে সম্মান করে।