নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে চালু হওয়া বিশেষ ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এর কথা জাতিসংঘের মন্ত্রী পর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি নিরাপদ গণপরিবহনের এই ব্যবস্থার কথাও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেন তিনি।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের ফাঁকে এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ক্রোয়েশিয়া ও জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের মূল আলোচনায় ছিল প্রযুক্তির মাধ্যমে নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা এবং এর প্রতিরোধে করণীয়।
বৈঠকে শামা ওবায়েদ বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে দ্রুত তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম, আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয়, সামাজিক সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তা।
নারীদের নিরাপদ চলাচলের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি সম্প্রতি চালু হওয়া ‘পিংক বাস সার্ভিস’-এর কথাও উল্লেখ করেন। নারীদের জন্য পৃথক এই বাসসেবার লক্ষ্য হলো গণপরিবহনে তাদের জন্য আরও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ১৮ আগস্ট নারী চালক ও নারী সহকারী দিয়ে পিংক বাস সার্ভিস চালু করে। শুরুতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় এই সেবা চালু করা হয়। ঢাকায় বিভিন্ন রুটে চলাচল করা এসব বাসে নারীদের জন্য পৃথক যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
জাতিসংঘের বৈঠকে শুধু গণপরিবহন নয়, প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে নারীদের ওপর সহিংসতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অনলাইন হয়রানি, মানহানি, পরিচয় জালিয়াতি, ছদ্মবেশ ধারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অপব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
শামা ওবায়েদ বাংলাদেশের নেতৃত্বাধীন ‘ঢাকা ডায়ালগ’ উদ্যোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন। ডিজিটাল হয়রানি প্রতিরোধ, তদন্ত এবং এ ধরনের ঘটনার মোকাবিলায় স্বেচ্ছামূলক নির্দেশিকা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ‘ঢাকা ডায়ালগ’-এর ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস’-এ যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যে সংঘাত ও সংকটে থাকা নারীদের সুরক্ষার বিষয়টিও উঠে আসে। এ সময় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারী ও কন্যাশিশুদের সুরক্ষা ও সহায়তায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নেওয়া দেশ ও সংস্থাগুলোর সামনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মূলত দুটি বাস্তবতার কথা তুলে ধরা হয়—নারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল সহিংসতার নতুন ধরন মোকাবিলা করা। পিংক বাস সার্ভিসকে এই বৃহত্তর নারী সুরক্ষা উদ্যোগের একটি অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেন শামা ওবায়েদ।
জাতিসংঘের এই বৈঠকে বাংলাদেশের বক্তব্যে তাই একদিকে যেমন নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের কথা এসেছে, অন্যদিকে নিরাপদ গণপরিবহন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার মতো দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।