• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

কারাগারে রাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাইরে নেওয়া হতো: তানভীর

newsline24 / ২৬ Time View
Update : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কারাগারে রাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাইরে নেওয়া হতো তানভীর
কারাগারে রাতে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাইরে নেওয়া হতো তানভীর

কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের রাতে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হতো এবং ভোরে আবার ফিরিয়ে আনা হতো—এমন অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। তাঁর দাবি, কারাগারে এসব ঘটনা দেখতে পাওয়াই পরে তাঁর জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়ায়।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি কারাগার ও রিমান্ডে নিজের ওপর নির্যাতন, চিকিৎসায় অবহেলা এবং কারাগারে বন্দীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এসব অভিযোগ করেন। অসুস্থতার কারণে তানভীর নিজে পুরো বক্তব্য দিতে পারেননি। তাঁর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।

তানভীরের ভাষ্য, যে কক্ষে তাঁকে রাখা হয়েছিল, সেখান থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অবস্থান ও চলাফেরা দেখা যেত। তাঁদের কেউ ফোনে কথা বলতেন, ভালো খাবার পেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ করতেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে রাতে কয়েকজন নেতাকে গাড়িতে করে কারাগারের বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং ভোরে ফিরিয়ে আনার ঘটনাও নিজের চোখে দেখেছেন বলে জানান।

তিনি বলেন, এসব ঘটনা দেখার কারণেই তাঁর ওপর পরবর্তী সময়ে নির্যাতন নেমে আসে বলে তিনি মনে করেন। তবে তাঁর এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

নির্যাতন ও হুমকির অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে তানভীর দাবি করেন, ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগার ও রিমান্ডে তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের কথা বাইরে প্রকাশ করলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ‘গুম’ করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর অভিযোগ, বগুড়া কারাগারে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটি ছিল অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন এবং বিদ্যুৎবিহীন। সেখানে কোনো ফ্যানও ছিল না। কারারক্ষী ও আশপাশের কয়েকজন বন্দীর বিরুদ্ধে তাঁকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করার অভিযোগও করেন তিনি।

তানভীর আরও দাবি করেন, কারাগারে যাওয়ার পর তাঁকে পচা ও বাসি খাবার দেওয়া হতো। একপর্যায়ে তাঁর ডায়রিয়া দেখা দেয়। চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক যে ওষুধ লিখেছিলেন, তা না দিয়ে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

৭০-৮০টি ইনজেকশন দেওয়ার দাবি

তানভীরের দাবি, অসুস্থ অবস্থায় তাঁর শরীরে অন্তত ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এসব ইনজেকশন কীসের ছিল, সে বিষয়ে তাঁকে জানানো হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে তাঁকে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। এরপর তাঁর ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তানভীর। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে একজন চিকিৎসক স্ট্রোক হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বলে তাঁর বক্তব্য। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্ট্রোক হয়নি বলে জানায়—এমন অভিযোগও করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর সিটি স্ক্যান করা হলেও রিপোর্ট সম্পর্কে তাঁকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এমআরআই মেশিন নিয়ে জটিলতার মধ্যেই পরীক্ষা করার সময় বিকট শব্দ হয়ে মেশিন বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় অচেতন ছিলেন এবং কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তানভীর।

ঢাকায় চিকিৎসা, কারাগারে ফেরার পথে নির্যাতনের অভিযোগ

শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। তানভীর জানান, কেরানীগঞ্জে তাঁকে যে সেলে রাখা হয়েছিল, সেটির পরিবেশও ভালো ছিল না। পরে চিকিৎসার জন্য পিজি হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখান থেকে কারাগারে ফেরার পথে সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন এবং তাঁকে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর দাবি, নির্যাতনের সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ ও সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া অন্যদেরও একইভাবে নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংবাদ সম্মেলনের সময় পাওয়া যায়নি।

বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে তানভীর বলেন, তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। প্রস্রাব-পায়খানার জন্য ব্যাগ ও প্যাড ব্যবহার করতে হচ্ছে। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি এবং তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়েছে বলে জানান।

গ্রেপ্তার থেকে জামিন পর্যন্ত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২ আগস্ট তাঁর বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় মামলাটি করা হয়েছিল। পরে তাঁকে বগুড়ায় নেওয়া হয় এবং আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয়।

রিমান্ডে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আনা হয় এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জামিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তাঁর এক বছরের জামিন মঞ্জুর করেছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারসহ দলটির কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তানভীরের অভিযোগ তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান সারোয়ার তুষার।

দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি

তানভীরকে এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিবের দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও মামলার আগেই ঘটে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে জুলাইয়ের শেষ দিকে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলেও তাঁকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছিল এনসিপি। সে সময় জেলা প্রশাসক নিয়োগে হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তোলার পর তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রায় এক বছর পর সেই অব্যাহতির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

কারাগারে নির্যাতন, চিকিৎসায় অবহেলা এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে তানভীরের অভিযোগ এখন তদন্তের দাবি তুলেছে। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টির পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category