ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামী ২ অক্টোবর থেকে দেশজুড়ে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শুক্রবার জানিয়েছেন, শনিবারের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে মুম্বাই থেকে আন্দোলন শুরু হবে। পরে তা ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দীপকে বলেন, জ্ঞানেশ কুমার শনিবারের মধ্যে পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করবে সিজেপি। ওই দিন গান্ধী জয়ন্তী উপলক্ষে কর্মসূচি শুরুর কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
এর এক দিন আগে বৃহস্পতিবার জ্ঞানেশ কুমারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগের সময়সীমা দিয়েছিল সিজেপি। সংগঠনটির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নিয়ে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এসব আপত্তির একটি বড় অংশ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভোটারের নাম যুক্ত করা, বাদ দেওয়া, পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভোটার-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আরও সরব হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় পরিবর্তনের ফলে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
কমিশনের বক্তব্য, একটি বহুসদস্যের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আলোচনা, পর্যালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশ স্বাভাবিক বিষয়। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা প্রশ্ন বা পর্যবেক্ষণ জানালেই সেটিকে প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কমিশন আরও বলেছে, তাদের সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। একই সঙ্গে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, তাকে পদ থেকে সরানো এবং তার দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত ও ভোটার তালিকার পরিবর্তন স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি নির্বাচন কমিশনের অবস্থানকে সমর্থন করেছে। দলটির নেতারা দাবি করেছেন, নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার কারণে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে। বিজেপির পক্ষ থেকে কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা ও স্বাধীনতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টি চলতি বছর তরুণদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে। এর আগে দিল্লির যন্তর মন্তরে সংগঠনটির দীর্ঘ বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়েছিল। সেই আন্দোলনের পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সঙ্গে নিজেদের আন্দোলনের যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি করে সংগঠনটি।
এবার নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা। বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে একাধিক দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটি আসন্ন কয়েকটি নির্বাচন স্থগিত রাখা, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং আগের ভোটার তালিকা পুনর্বহালের দাবিও তুলেছে। তাদের ভাষ্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শুক্রবারের ঘোষণায় সিজেপি জানিয়েছে, ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে আন্দোলন শুরু করে ধাপে ধাপে তা ভারতের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত বলে দাবি করছে এবং কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্যকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এখন মূলত নজর থাকবে শনিবারের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার কোনো সিদ্ধান্ত নেন কি না এবং পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর সিজেপির ঘোষিত আন্দোলন কতটা বিস্তৃত হয়।