• শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

জাতিসংঘে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন তারেক রহমান

newsline24 / ২১ Time View
Update : শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতিসংঘে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন তারেক রহমান
জাতিসংঘে বাংলাদেশের পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ পরিকল্পনা তুলে ধরলেন তারেক রহমান

বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সরকারের ‘থ্রি-আর’ কৌশল—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দেড় দশকের শাসন-শোষণের পর বাংলাদেশকে নতুন পথে এগিয়ে নিতে এই তিন ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ।

ভাষণে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়েছে—এমন দাবি করে তিনি বলেন, গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো সমস্যার অবসান ঘটিয়ে দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনঃস্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন।

কর্মসংস্থান ও তরুণদের ওপর জোর

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশের বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথা ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও আলাদা গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী হওয়ায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ ও সামাজিক সুরক্ষা

শুধু ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, অর্থনীতির সুফলও যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে—এমন লক্ষ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষণে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন’ ধারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এ লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ডকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে দেখছে সরকার। বিভিন্ন খাতের সহায়তা এক প্ল্যাটফর্মে আনতে ভবিষ্যতে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

এর আগে জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যেও সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড, খেলোয়াড়দের জন্য স্পোর্টস কার্ড এবং স্বাস্থ্যসেবায় ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন- পুনঃখনন এবং ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের কর্মসূচির কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিতে গুরুত্ব

জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের অগ্রাধিকারের খাত হিসেবে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। কর্মমুখী ও নৈতিকতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুযোগ যেন কেবল উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

তাঁর মতে, বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত হওয়া উচিত নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকট

বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতের সমাধানে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ভূমিকা চান তিনি।

ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি ভাষণে তুলে ধরে তারেক রহমান তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন। মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারেই সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন ও জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশের নদী-খাল ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

এলডিসি উত্তরণে সহায়তা চাইল বাংলাদেশ

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষেও অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে পারস্পরিক নির্ভরশীল বিশ্বব্যবস্থায় সহযোগিতার মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’

ভাষণের শেষদিকে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের লক্ষ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। তিনি এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে রাজনৈতিক মত, ধর্ম বা পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবেন।

তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ, নারীদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলা এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের পরিবেশ তৈরির কথাও বলেন তিনি। বক্তব্যের শেষাংশে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিশ্বশান্তি ও মানবতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নিরস্ত্রীকরণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মতো আন্তর্জাতিক বিষয়ও গুরুত্ব পায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category