রাশিয়ার আমুর অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি বৃহৎ গ্যাস-রাসায়নিক প্রকল্পে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের একজন শ্রমিক রয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
মস্কোয় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস নিহত বাংলাদেশি শ্রমিকের পরিচয় নিশ্চিত করেছে। তাঁর নাম জাকির হোসেন। তিনি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার বাসিন্দা। দুর্ঘটনার পর তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
এ ঘটনায় মো. আলাল হোসেন রাজু নামে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার আরেক বাংলাদেশি শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্ঘটনার আগুনে কয়েকটি মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে সেগুলোর পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে রাজু থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন দূতাবাসের কর্মকর্তারা। তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও অনুসন্ধান চলছে।
অগ্নিকাণ্ডে আরও সাতজন বাংলাদেশি শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন বর্তমানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। আহতদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের মস্কোর বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা, নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং দুর্ঘটনার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাস। আহতদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনাটি ঘটেছে রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের প্রধান গ্যাস-রাসায়নিক প্রকল্প আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে, যা এজিসিসি নামেও পরিচিত। প্রকল্পটি এখনো নির্মাণাধীন। এটি রাশিয়ার জ্বালানি ও রাসায়নিক খাতের একটি বড় বিনিয়োগ প্রকল্প হিসেবে পরিচিত।
আমুর গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্স রাশিয়ার সিবুর এবং চীনের সিনোপেকের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে। প্রকল্পের নির্মাণকাজে বিভিন্ন দেশের শ্রমিক ও কর্মী যুক্ত রয়েছেন। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্মাণাধীন শিল্প প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করায় দুর্ঘটনার পর হতাহতের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তবে আগুন কীভাবে শুরু হয়েছিল, অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ কী এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নিহত জাকির হোসেনের মরদেহ দেশে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাস। একই সঙ্গে তাঁর বকেয়া পাওনা ও প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছে দূতাবাস।
এ জন্য ‘সিনোপেক ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ এলএলসি’র সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা। নিহত শ্রমিকের পরিবারের কাছে তাঁর পাওনা অর্থ ও ক্ষতিপূরণ যথাযথভাবে পৌঁছানো এবং মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনায় নিখোঁজ রাজুর পরিবারের জন্যও পরিস্থিতিটি গভীর উদ্বেগের। আগুনে কয়েকটি মরদেহের পরিচয় এখনো নিশ্চিত না হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা বা অন্যান্য শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা তথ্য এখনো জানানো হয়নি।
রাশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আহতদের চিকিৎসা, নিখোঁজ শ্রমিকের সন্ধান, নিহতের মরদেহ দেশে ফেরানো এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং রাশিয়ার জনগণ ও সরকারের প্রতিও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে।
এখন বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিখোঁজ রাজুর বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া। পাশাপাশি নিহত জাকির হোসেনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং তাঁর প্রাপ্য পাওনা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিতে হচ্ছে। রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাস।