ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই মক্কার দিকে একটি হুথি ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তবে হুথিরা এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ফলে পবিত্র নগরী মক্কাকে ঘিরে সৌদি দাবি ও হুথিদের পাল্টা বক্তব্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালিকি জানিয়েছেন, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মক্কার দক্ষিণে একটি ড্রোন শনাক্ত করে সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেটি ভূপাতিত করে। তাঁর দাবি, ড্রোনটি মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ধ্বংস করা হয় এবং এর ধ্বংসাবশেষ শহরের দক্ষিণে পড়ে। সৌদি কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে মক্কাকে লক্ষ্য করে হুথিদের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর আগে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগও হুথিদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল।
তবে হুথি রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হেজাম আল-আসাদসহ গোষ্ঠীটির নেতারা অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, মক্কা বা পবিত্র স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানো হয়নি। হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোই তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তারা মক্কায় হামলার অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এদিকে মক্কার ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ভূখণ্ডের বিভিন্ন শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ এলাকায় বেসামরিক মানুষ আহত এবং কয়েকটি বাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংঘাতের এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা সহযোগিতার পরিধিও বাড়ছে। আঞ্চলিক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জেরুজালেম পোস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের মাধ্যমে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে হুথিদের মোকাবিলায় গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার লক্ষ্য সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করা।
সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যোগাযোগও সাম্প্রতিক সময়ে জোরদার হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও মার্কিন সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের মধ্যে বৈঠকে ইয়েমেন পরিস্থিতি এবং হুথিদের হামলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওয়াশিংটন সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়ার পরিবর্তে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তার বিষয়ে এগিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য নতুন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের উদ্যোগও নিয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইসরায়েলের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তির পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৪০ হাজার ২ হাজার পাউন্ডের বোমা অন্তর্ভুক্ত। তবে এই অস্ত্রচুক্তিকে সৌদি-ইসরায়েল গোয়েন্দা সহযোগিতার সরাসরি অংশ হিসেবে দেখানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
মক্কাকে ঘিরে বিতর্কের মূল বিষয় এখন দুটি। প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষ যে ড্রোনটিকে হুথিদের বলে দাবি করছে, সেটির প্রকৃত উৎস নিয়ে হুথিরা ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই অভিযোগের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মক্কা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম পবিত্র স্থান হওয়ায় সেখানে হামলার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আবেগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
এ মুহূর্তে প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সৌদি আরব মক্কার কাছে একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে এবং হুথিরা সেই হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ড্রোনটির উৎস ও উদ্দেশ্য নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ফলে বিষয়টির পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।