শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার খবর প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গণমাধ্যমে এ বিষয়ে খবর দেখলেও ঢাকা থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বার্তা পায়নি তারা। তবে ভারতের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি। (Web India 123)
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত দ্বি-সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ অবস্থান জানান। সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
এএনআইয়ের এক প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশ সরকারের চুক্তি পর্যালোচনার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন তারা দেখেছেন। তবে এ নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ভারতের স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। (Web India 123)
এর আগে ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছিলেন, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে সরকার। এসব চুক্তির কোনোটিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো শর্ত রয়েছে কি না, তা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। (The Daily Star)
চুক্তিগুলোর মধ্যে বন্দর ব্যবহার, যোগাযোগসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার বিষয়ও রয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে পর্যালোচনার ফলাফল কী হবে বা কোন কোন চুক্তিতে পরিবর্তন আনা হতে পারে, সে বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত ঘোষণা দেয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার খবর নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। জয়সওয়াল বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের।
ভারত সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের আইন অনুযায়ী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গও সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। এ ধরনের আঞ্চলিক সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে দিল্লি সতর্কভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জয়সওয়াল জানান। (The Business Standard)
এর আগে বাংলাদেশ ওই প্রতিরক্ষা উদ্যোগে আমন্ত্রণ পেলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল বলে ভারতীয় ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। জয়সওয়াল তখনও বলেছিলেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সব বিষয় তারা পর্যবেক্ষণে রাখছে। (The Business Standard)
পাকিস্তান ও কুয়েতের সামরিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সম্পর্ক নিয়েও ভারতের অবস্থান একই—আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে পারে এমন যেকোনো উদ্যোগকে দিল্লি নজরে রাখছে।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি। ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬ সালে সই হওয়া ৩০ বছরের এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। (ICWA)
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়। জয়সওয়াল বলেন, গঙ্গার পানি বণ্টনসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি সংক্রান্ত বিষয় দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মধ্যেই আলোচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ে বৈঠকও চলমান রয়েছে। (Dhaka Tribune)
বাংলাদেশ ও ভারত ৫৪টি অভিন্ন নদী ভাগ করে নেয় এবং এসব নদীসংক্রান্ত বিষয় আলোচনার জন্য জেআরসি দুই দেশের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামো হিসেবে কাজ করে আসছে। (Web India 123)
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত এগিয়ে আসছে, এর নবায়ন বা নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারতের সংসদীয় জবাবেও জানানো হয়েছিল, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক নবায়ন আলোচনা শুরু হয়নি। (PolicyIndex)
এদিকে ভারতের পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও গঙ্গা চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সম্প্রতি জানিয়েছেন, চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের পানীয় ও শিল্পখাতের পানির চাহিদার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। (The Economic Times)
ফলে ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনা, সীমান্ত ও সংখ্যালঘু ইস্যু, সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং গঙ্গা পানি বণ্টন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন একই সময়ে আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনার অগ্রগতির ওপর।