আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও কমেছে স্বর্ণের দাম। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে স্পট গোল্ডের মূল্য ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৫৭৬ দশমিক ৩০ ডলারে নেমেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিন মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল মূল্যবান ধাতুটির দাম। ফলে কয়েক দিনের ব্যবধানেই স্বর্ণের বাজারে ওঠানামা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমান ডলার বিনিময় হার ধরে হিসাব করলে আন্তর্জাতিক বাজারের দামে এক আউন্স স্বর্ণের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক গ্রাম স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় আনুমানিক ১৮ হাজার ১০০ টাকা। আর ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম ওজনের এক ভরি স্বর্ণের মূল্য প্রায় ২ লাখ ১১ হাজার টাকা।
তবে এই হিসাবকে বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারের স্বর্ণের দাম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট মূল্যের সঙ্গে দেশের বাজারদরের পার্থক্য থাকে। বাংলাদেশে স্বর্ণের চূড়ান্ত দামে কর, শুল্ক, মজুরি, পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যয় যুক্ত হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে একই হারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচারসের দামও কমেছে। শুক্রবার ফিউচারসের মূল্য ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৬২৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ স্পট মার্কেটের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তিভিত্তিক বাজারেও স্বর্ণের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বর্ণের সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতির সম্ভাব্য গতিপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্টোনএক্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যাট সিম্পসনের মতে, কেভিন ওয়ারশের কাছ থেকে তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতির ইঙ্গিত এলে স্বল্পমেয়াদে সাম্প্রতিক উচ্চ অবস্থান থেকে স্বর্ণের দাম আরও নেমে যেতে পারে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বড় প্রভাব ফেলে। সাধারণত সুদের হার বেশি থাকলে সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যায়। কারণ বিনিয়োগকারীরা তখন সুদ বা নির্দিষ্ট আয় পাওয়া সম্পদের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারেন। বিপরীতে সুদের হার কমার প্রত্যাশা তৈরি হলে স্বর্ণে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়তে দেখা যায়।
ম্যাট সিম্পসনের মতে, যারা স্বর্ণের দাম প্রথম দফায় বাড়ার সময় বাজারে প্রবেশ করতে পারেননি, সাম্প্রতিক দরপতন তাদের জন্য অপেক্ষাকৃত কম দামে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে স্বর্ণের বাজারে দাম ওঠানামার ঝুঁকি থাকায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের গতিপথ ও নীতিগত পরিবর্তন বিবেচনা করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জ্যাকসন হোল সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। এর এক দিন আগে প্রকাশিত তথ্যেও মূল্যস্ফীতির চাপের বিষয়টি সামনে আসে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের মূল্যস্ফীতির প্রধান সূচক পার্সোনাল কনজাম্পশন এক্সপেন্ডিচার্স বা PCE মূল্যসূচক ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তাই বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার জ্যাকসন হোল সম্মেলনে ফেডের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশের বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। তার বক্তব্যে সুদের হার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অবস্থানের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় কি না, সেদিকে নজর রাখছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
সিএমই ফেডওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ হিসেবে বিবেচনা করছে বাজার। আর ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৭৪ শতাংশ বলে ধরা হচ্ছে। এসব প্রত্যাশা পরিবর্তিত হলে ডলার ও বন্ডের পাশাপাশি স্বর্ণের বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা স্বর্ণের ওপর চাপ তৈরি করলেও বাজারে মূল্যবান ধাতুটির জন্য কিছু ইতিবাচক উপাদানও রয়েছে। এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ETF এবং ফিউচারস বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ স্বর্ণের দামে কিছুটা সমর্থন দিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা বাড়লে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণকে তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেন। এ কারণে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আচরণও স্বর্ণের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে সামনে স্বর্ণের বাজারে আরও কিছুটা দরপতন অথবা সাময়িক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন ওসিবিসির মূল্যবান ধাতু কৌশলবিদ ক্রিস্টোফার ওয়ং। ফলে সাম্প্রতিক রেকর্ড বা বহুদিনের উচ্চ দামের পর বাজারে এখন যে সংশোধন চলছে, তা কতটা স্থায়ী হবে—সেটিই হয়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের বড় প্রশ্ন।
স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান গতিপথ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রানীতি, মূল্যস্ফীতির তথ্য, সুদের হারের প্রত্যাশা এবং বিনিয়োগকারীদের চাহিদার ওপর নির্ভর করছে। আগামী দিনের নীতিগত বক্তব্য ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান তাই মূল্যবান এই ধাতুটির দামে নতুন দিকনির্দেশ দিতে পারে।