মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য থাকলেও বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেছেন, মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত শক্তিই শত্রুদের ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরানের সামিট হলে ৪০তম আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
পেজেশকিয়ান বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে এসব বিভেদকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর স্বার্থ উপেক্ষা করা উচিত নয়। মুসলিম দেশগুলোকে নিজেদের অভিন্ন স্বার্থ চিহ্নিত করে পারস্পরিক আস্থা, সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ইসলামি ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর চিন্তায় ইসলামি ঐক্য ছিল মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান কৌশল।
বক্তব্যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, ইরান সংঘাত শুরু করেনি; বরং হামলার জবাবে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, আত্মরক্ষার অর্থ কোনো প্রতিবেশী বা অন্য মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে বৈরী অবস্থান নেওয়া নয়।
তিনি বলেন, কোনো মুসলিম দেশের নিরাপত্তা যেন অন্য কোনো মুসলিম দেশের অনিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল না হয়। একইভাবে একটি ইসলামি দেশের ভূখণ্ডকে অন্য ইসলামি দেশের বিরুদ্ধে সামরিক বা আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত সামর্থ্যের দিকটিও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন বা ওআইসির ৫৭টি সদস্যরাষ্ট্রে দুই বিলিয়নেরও বেশি মুসলমান বসবাস করেন। এসব দেশের হাতে রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ, বড় ভোক্তা বাজার, তরুণ জনশক্তি এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।
তবে এত বিপুল সম্পদ ও জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও মুসলিম দেশগুলো এখনো নিজেদের সম্মিলিত শক্তিকে কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় পুরোপুরি রূপ দিতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এই সামর্থ্যকে কাজে লাগাতে হলে পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন পেজেশকিয়ান। তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি ইরানের সমর্থনকে নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে বিষয়টি কোনো সাম্প্রদায়িক বিবেচনার পরিবর্তে মানবিক ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের জন্য কয়েকটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন ইরানের প্রেসিডেন্ট। এর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও অনাক্রমণ চুক্তি, ওআইসির অধীনে স্থায়ী মধ্যস্থতা ও সংঘাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো।
পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আগ্রহও প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে একক কোনো দেশের সামরিক সক্ষমতার পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘ইসলামি বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনির চিন্তায় ইসলামি ঐক্য’ প্রতিপাদ্যে এবারের আন্তর্জাতিক ইসলামি ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সম্মেলনটি আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত তেহরান, কোম ও মাশহাদে চলবে। পাশাপাশি পশ্চিম আজারবাইজান, কোরদেস্তান, গোলেস্তান ও রাযাভি খোরাসান প্রদেশেও বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের কথা রয়েছে।
সম্মেলনে ইসলামি ঐক্য, শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। ইসলামি পরিচয়, সুশাসন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ফিলিস্তিন ও লেবানন পরিস্থিতিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রাখা হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে মূলত মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক বিরোধ কমিয়ে অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতার একটি কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাই সামনে এসেছে। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে মুসলিম দেশগুলোর বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব—এমন প্রত্যাশাই সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে।