গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত নতুন মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘এমআরটি লাইন-২’ নামের এই প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে পুরান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান ও পরিকল্পনাধীন অন্যান্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পটির।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ করিডরে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-২-এর মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। এ পথে ২৪টি স্টেশন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। রুটের কিছু অংশ মাটির নিচ দিয়ে এবং কিছু অংশ উড়ালপথে নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গাবতলী থেকে শুরু হয়ে রুটটি ঢাকা উদ্যান, বছিলা মোড়, মোহাম্মদপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুরের দিকে যাবে। এরপর লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। এই শাখা যুক্ত হলে পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ কয়েকটি এলাকার সঙ্গে মেট্রোরেল যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এমআরটি লাইন-২-এর রুট নিয়ে শুরুতে গাবতলী থেকে ডেমরা পর্যন্ত এবং গাবতলী থেকে ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত দুটি সম্ভাব্য পথ বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে নারায়ণগঞ্জকে প্রকল্পের আওতায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের মতামতের ভিত্তিতে গত মে মাসে নারায়ণগঞ্জকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্পের প্রাক প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব বা পিডিপিপি তৈরি করা হয়। বর্তমানে সেই পিডিপিপি পর্যালোচনা করছে পরিকল্পনা কমিশন।
পরিকল্পনা কমিশনের মতামত পাওয়ার পর প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠানো হবে। এরপর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। ঋণ নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমীক্ষা শেষ হলে প্রকল্পের মূল বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করার কথা রয়েছে।
৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পে বড় অঙ্কের অর্থায়ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকে এমআরটি লাইন-২ প্রকল্পে অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেওয়া হয়।
এআইআইবির সঙ্গেও ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ঋণের চূড়ান্ত পরিমাণ, শর্ত এবং অর্থায়নের কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পের পিডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়নের বিষয়টি আরও এগোবে।
এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়িত হলে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, নিউমার্কেট, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, ডেমরা এবং নারায়ণগঞ্জের মধ্যে দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জমুখী সড়কে বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। নতুন এই রুট চালু হলে তাদের একটি অংশ দ্রুতগামী গণপরিবহন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারেন। একই সঙ্গে রাজধানীর অন্যান্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হলে পুরো নগরীর গণপরিবহন নেটওয়ার্ক আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের বাস্তবায়নের আগে অর্থায়ন, রুট ও স্টেশন চূড়ান্তকরণ, বিস্তারিত সমীক্ষা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালুর লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে এসব ধাপ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এগিয়ে নেওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন এমআরটি লাইন-২-এর পিডিপিপি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মতামতের অপেক্ষা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সেই মতামতের পর ঋণ সংগ্রহ ও প্রকল্পের পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু হবে।