নেপালের উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও নদীর ভয়াবহ স্রোতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুর্যোগের পর এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি পর্যটক ও পরিব্রাজকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান চালাতেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
গত বুধবার সকালে নেপালের রসুয়া ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় ভোতকোশি ও ত্রিশূলি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে আসায় পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয় এবং স্রোতের তোড়ে বহু ঘরবাড়ি, পাকা সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে বেশ কয়েকটি দুর্গম এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া হতাহত ও নিখোঁজের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজও চলছে। তাই হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোতে অন্তত ৬৬৭ জন পর্যটক ও পরিব্রাজক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২৭ জন নেপালি নাগরিক। পাহাড়ি অঞ্চলটি পর্যটক ও ট্রেকারদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় দুর্যোগের সময় সেখানে থাকা বিদেশিদের অবস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দুর্গত এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ৩১ জন বিদেশি নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পর্যটন বোর্ড। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন দক্ষিণ কোরিয়ার, দুজন যুক্তরাষ্ট্রের, দুজন রাশিয়ার, দুজন ইতালির, একজন ভারতের, একজন বুলগেরিয়ার এবং একজন সুইজারল্যান্ডের নাগরিক রয়েছেন। আরও ১৮ জনের জাতীয়তা যাচাই করা হচ্ছে।
নিখোঁজ পর্যটকদের সন্ধানে নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয়, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং স্থানীয় ট্রেকিং এজেন্সিগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কপথের কারণে স্থলপথে উদ্ধারকাজ অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযানে নেপালি সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অংশ নিয়েছেন। নদীর তীর, ভাটির এলাকা এবং ধ্বংসস্তূপে জীবিত মানুষের সন্ধানের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজও চালানো হচ্ছে।
এই দুর্যোগের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এত অল্প সময়ে কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথে নেমে এলো, তার কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। হিমালয়ের পাদদেশের পাহাড়ি নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ও ভূমির আকস্মিক পরিবর্তন বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এবারের পানির এই আকস্মিক বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এর পেছনে কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা দায়ী কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
প্রবল স্রোতের কারণে নদী অববাহিকার ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে বসবাসকারী মানুষের নিরাপদে সরে যাওয়ার সময়ও ছিল খুব কম। ফলে অনেকেই আকস্মিকভাবে পানির তোড়ে আটকা পড়েন। এখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করাই কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার।