নাটোরের গুরুদাসপুরে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সময় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে ২৯০ জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ২৭০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) মধ্যরাতে গুরুদাসপুর থানায় মামলাটি করেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল হক। সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্ব পালনরত পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়। তবে মামলা হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে থানার উপপরিদর্শক মো. রাকিবুল ইসলামকে। তিনি জানিয়েছেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করেছেন। যাচাই-বাছাই করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২৫ আগস্ট দুপুরে নন্দকুঁজা নদীতে ডুবে মারা যায় দুই শিশু—ফারহান ইসলাম (৮) ও লাম ইসলাম। ফারহান চন্দ্রপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে এবং লাম একই গ্রামের বাবুল ইসলামের ছেলে। দুজনই চন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, দুপুরে খাওয়ার পর দুই শিশু নদীর তীরের একটি আমবাগানে খেলছিল। খেলার একপর্যায়ে তারা নদীর কিনারায় গোসল করতে নামে। দুজনের কেউই সাঁতার জানত না। একপর্যায়ে নদীর স্রোতে তারা পানিতে তলিয়ে যায়।
নদীর পাড়ে থাকা এক ব্যক্তি শিশু দুটিকে পানিতে তলিয়ে যেতে দেখে চিৎকার শুরু করেন। পরে আশপাশের লোকজন পানিতে নেমে তাদের খোঁজ করেন। কিছু সময় পর দুই শিশুকে উদ্ধার করে নাটোর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।
দুই শিশুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। সন্ধ্যার দিকে মরদেহ দুটি চন্দ্রপুর ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজার প্রস্তুতি চলছিল। জানাজায় স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী সামসুল হকসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
পুলিশের মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শিশু দুটির মৃত্যুর পর আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে ঘটনাস্থলে যান এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব।
প্রথমে নিহত শিশু লামের বাড়িতে গিয়ে তার মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এরপর অন্য শিশু ফারহানের মরদেহের সুরতহাল করতে পুলিশ সদস্যরা চন্দ্রপুর ওয়াপদা বাজারসংলগ্ন ঈদগাহ মাঠে যান। সেখানে দুই শিশুর মরদেহের সুরতহাল প্রস্তুত করা হয়।
পুলিশের দাবি, জানাজা শেষে আইনি প্রক্রিয়া মেনে দুই শিশুর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর এবং বিষয়টি লিখিতভাবে থানায় জানানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এ নিয়ে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে পুলিশের বিরোধ তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ অবশ্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় মরদেহের কাফনের কাপড় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এতে জানাজায় উপস্থিত লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা সামসুল হকও বলেন, পুলিশের এমন আচরণে উপস্থিত মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি একপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে এসআই আবুল বাশার ও কনস্টেবল আবু রাকিব স্থানীয় একটি দোকানে আশ্রয় নেন। সেখানে একদল লোক তাঁদের ঘিরে রাখে এবং গালিগালাজ করতে থাকে।
প্রায় এক ঘণ্টা পর রাত ৮টার কিছু পরে তাঁরা দোকান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় এক ব্যক্তি বাঁশের লাঠি দিয়ে এসআই আবুল বাশারের মাথায় আঘাত করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। পরে কয়েকজন বাঁশের লাঠি, কাঠের বাটাম ও লোহার রড দিয়ে দুই পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তাঁরা স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন। সেখানেও হামলাকারীরা তাঁদের ওপর চড়াও হন বলে পুলিশের অভিযোগ। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে। পরে ওই রাতেই আহত দুই পুলিশ সদস্যকে গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
পুলিশের করা মামলায় নাজিরপুর ইউনিয়নের ওয়াপদা বাজার এলাকার ২০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে