একটি ব্যর্থ প্রেমের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের একটি সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য সামনে এনে দিয়েছে। প্রেমিক-প্রেমিকার বিরোধের জের ধরে করা এক অভিযোগের সূত্র ধরে ভারতের মহারাষ্ট্র পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (এমপিএসসি) ড্রাগ ইন্সপেক্টর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পরীক্ষার্থী ঋতুজা পাতিলের বাবা অমৃত পাতিল, নান্দুরবারের কৌটিল্য কোচিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রবীণ পাতিল, ঋতুজার সাবেক প্রেমিক গৌরব পাতিল এবং এমপিএসসির তিন কর্মকর্তা। আদালত তাঁদের আগামী ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
মেয়ের জন্য প্রশ্নপত্র কেনার অভিযোগ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ড্রাগ ইন্সপেক্টর পরীক্ষার্থী ঋতুজা পাতিলকে চাকরিতে এগিয়ে দিতে তাঁর বাবা অমৃত পাতিল কোচিং ইনস্টিটিউটের পরিচালক প্রবীণ পাতিলের কাছ থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তকারীদের ধারণা, প্রবীণের সঙ্গে এমপিএসসির কয়েকজন কর্মকর্তার প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ লাখ রুপির লেনদেন হয়েছিল। পুরো লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১২ লাখ রুপি হতে পারে বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে অর্থ লেনদেনের পুরো বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
পরীক্ষার আগে ঋতুজা ওই প্রশ্নপত্র তাঁর তৎকালীন প্রেমিক গৌরব পাতিলের সঙ্গেও শেয়ার করেছিলেন বলে পুলিশের দাবি। এরপরই ঘটনাটি নেয় নাটকীয় মোড়।
প্রেমিকা পাস, প্রেমিক ফেল
গত ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত ড্রাগ ইন্সপেক্টর পরীক্ষায় ঋতুজা উত্তীর্ণ হন। কিন্তু গৌরব পরীক্ষায় পাস করতে পারেননি। ফলাফল প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সম্পর্ক ভেঙে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গৌরব মনে করেছিলেন, সরকারি চাকরি পাওয়ার পর ঋতুজা তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারেন। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর ক্ষোভ থেকে তিনি এমপিএসসির কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ করেন।
ইমেইলের মাধ্যমে করা সেই অভিযোগই পরে তদন্তের সূত্র হয়ে দাঁড়ায়। যদিও অভিযোগ করার পর গৌরব বুঝতে পারেন, বিষয়টি তদন্তে গেলে তিনিও প্রশ্নপত্র পাওয়ার ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে পারেন। তখন তিনি অভিযোগটি প্রত্যাহারের চেষ্টা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে এমপিএসসি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে বেরিয়ে আসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তথ্য
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, বিশেষজ্ঞদের তৈরি প্রশ্নভাণ্ডার থেকে বেআইনিভাবে প্রশ্ন সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে সেগুলো ব্যবহার করে পরীক্ষার আগে একটি প্রশ্নপত্র তৈরি ও গোপনে সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ।
এ ঘটনায় চলতি সপ্তাহের শুরুতে মামলা করা হয়। এরপর বুধবার মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চ গৌরব পাতিল, অমৃত পাতিল, প্রবীণ পাতিল এবং এমপিএসসির তিন কর্মকর্তা বিশ্বেশ্বর দত্তাত্রয় নাকাত, অভিজিৎ গণপনরাও লেন্দভে ও গোপাল ভাট্টু মারাঠেকে গ্রেপ্তার করে।
আদালতে হাজির করার পর তাঁদের ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, কারা এর সঙ্গে যুক্ত এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে হয়েছে—এসব বিষয় এখন তদন্তের আওতায় রয়েছে।
বাতিল পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের তদন্তের পর এমপিএসসি ড্রাগ ইন্সপেক্টর, গ্রুপ-বি পদের পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করেছে।
গত ২২ মার্চ মহারাষ্ট্রের ছয়টি বিভাগীয় সদরে অফলাইনে এই স্ক্রিনিং পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরে ১২ জুন ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ৫০৬ জন পরীক্ষার্থী সাক্ষাৎকারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হন। তাঁদের মধ্যে ৪৮৮ জন ১ জুলাই থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারে অংশ নেন।
তবে ২২ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে কমিশনের কাছে পরীক্ষার্থী ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে একাধিক অভিযোগ আসে। অভিযোগে বলা হয়, পরীক্ষার দুই দিন আগেই কিছু পরীক্ষার্থী প্রশ্নপত্র বা প্রশ্নের বিষয়বস্তু পেয়ে গিয়েছিলেন। পরে সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।
তদন্তের ফল বিবেচনায় নিয়ে কমিশন বর্তমান নিয়োগপ্রক্রিয়া আর এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরো প্রক্রিয়াই বাতিল করা হয়েছে।
আবার হবে পরীক্ষা, নতুন ফি লাগবে না
এমপিএসসি জানিয়েছে, ড্রাগ ইন্সপেক্টর পদে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে। যারা এরই মধ্যে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের নতুন করে আবেদন করতে হবে না। একইভাবে পুনরায় আবেদনের জন্য কোনো অতিরিক্ত ফিও দিতে হবে না।
একটি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে একাধিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। আর পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে এমন এক অভিযোগ থেকে, যার পেছনে ছিল ভেঙে যাওয়া একটি প্রেমের সম্পর্ক। এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল প্রশ্ন—প্রশ্নপত্র ফাঁসের পুরো নেটওয়ার্কে আর কারা যুক্ত ছিলেন এবং কীভাবে পরীক্ষার গোপন প্রশ্ন বাইরে পৌঁছেছিল।