পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর গত চার বছরে ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ের মাওয়া টোল প্লাজা থেকে ধলেশ্বরী টোল প্লাজা পর্যন্ত অংশে ৫৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৮৭৪ জন আহত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে দুর্ঘটনার এই চিত্র।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন থেকে ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় চার বছরের সময়ে এক্সপ্রেসওয়ের নির্ধারিত অংশে ৫৪৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ এই সময়ে গড়ে প্রতি তিন দিনে প্রায় একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিটি ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার সংখ্যার পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৫৪৮টি দুর্ঘটনায় ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৮৭৪ জন। এসব দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। পদ্মা সেতু চালুর পর এই করিডরে যানবাহন চলাচলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন ধরনের যান নিয়মিত এই পথে চলাচল করে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, এক্সপ্রেসওয়েতে দিন দিন যানবাহনের চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। দুর্ঘটনা কমাতে চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তাঁর মতে, দ্রুতগতির সড়কে চালকের সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেকিং, অতিরিক্ত গতি এবং ট্রাফিক নির্দেশনা না মানার মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
সড়ক দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাতে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির ভেতরে আটকে পড়া ব্যক্তিদের বের করে আনতেও তাঁদের ঝুঁকি নিতে হয়।
মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম জানান, এসব দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটাররা ঝুঁকি নিয়ে আহতদের উদ্ধার করেছেন এবং হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরও করেছেন তাঁরা।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হলেও প্রাণহানি ঠেকানোর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আগেই সতর্ক হওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। কারণ দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর উদ্ধার তৎপরতা যত দ্রুতই হোক, প্রাণহানি সব সময় ঠেকানো সম্ভব হয় না।
দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের সড়কে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকা এবং নির্ধারিত গতিসীমার মধ্যে গাড়ি চালানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সড়কের নির্দেশনা ও ট্রাফিক সিগন্যাল যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। সামনে থাকা গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাও জরুরি। হঠাৎ সামনে কোনো যান ধীরগতির হলে বা থেমে গেলে পর্যাপ্ত দূরত্ব না থাকলে সংঘর্ষের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
অসতর্কতা ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে চালকের ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে—এ কারণে চালকদের নিজেদের সক্ষমতা ও সড়কের পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে গাড়ি চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট পর্যন্ত মাওয়া টোল প্লাজা থেকে ধলেশ্বরী টোল প্লাজা পর্যন্ত অংশে দুর্ঘটনার সার্বিক চিত্র হলো—
এই পরিসংখ্যান শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা নয়, এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপদ যান চলাচল নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এই সড়কের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে সড়কটি ব্যবহারকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মুহাম্মদ সফিকুল ইসলামের মতে, চালক ও যাত্রীরা ট্রাফিক আইন মেনে চললে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখলে, নির্ধারিত গতিতে গাড়ি চালালে এবং বেপরোয়া আচরণ এড়িয়ে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
চার বছরে ৫৪৮ দুর্ঘটনায় ১৪৭ জনের প্রাণহানির এই হিসাব তাই এক্সপ্রেসওয়েতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালক, যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবার আরও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তাই সামনে আনছে।