দ্রুত ক্ষুধা মেটানো আর স্বাদের ভিন্নতা—এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বার্গার। শিশু থেকে তরুণ, এমনকি বয়স্কদের কাছেও ফাস্টফুডের তালিকায় এটি বেশ পরিচিত একটি নাম। মাংস, সবজি, চিজ, বিভিন্ন সস ও নানা ধরনের টপিংয়ের সমন্বয়ে তৈরি করা যায় এই খাবার। তাই স্বাদের বৈচিত্র্যও কম নয়।
প্রতি বছর ২৮ মে আন্তর্জাতিক বার্গার দিবস পালিত হয়। দিনটি উপলক্ষে অনেকে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বার্গার খান। কেউ কেউ আবার ঘরেই পছন্দের উপকরণ দিয়ে তৈরি করেন নিজেদের পছন্দের বার্গার। বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁতেও নানা আয়োজন দেখা যায়।
বার্গারের ইতিহাস নিয়ে এখনো বিতর্ক
হ্যামবার্গারকে যুক্তরাষ্ট্রের ফাস্টফুড সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে খাবারটির প্রকৃত উৎপত্তি কোথায় এবং কে প্রথম এটি তৈরি করেছিলেন, তা নিয়ে এখনো ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
‘হ্যামবার্গার’ নামটির সঙ্গে জার্মানির হামবুর্গ শহরের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনায় দেখা যায়, মাংস কিমা করে খাবার তৈরির প্রচলন ইউরোপে আগে থেকেই ছিল। হামবুর্গের মাংসের খাবারের ধারণা পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নতুন রূপ পায় বলে অনেকের মত।
১৭৫৮ সালে প্রকাশিত একটি রান্নার বইয়ে ‘হামবুর্গ সসেজ’ নামে একটি খাবারের রেসিপির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই ধরনের খাবার থেকেই পরবর্তী সময়ে হ্যামবার্গারের ধারণা বিকশিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে এটিই যে আধুনিক বার্গারের সরাসরি উৎস, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
লুই ল্যাসেন থেকে বিশ্বমেলা—বিভিন্ন দাবিই প্রচলিত
বার্গারের উদ্ভাবক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাভেনের ব্যবসায়ী লুই ল্যাসেনের নাম প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। একটি প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯০০ সালের দিকে দ্রুত খাবার চাওয়া এক ক্রেতার জন্য ল্যাসেন রুটির দুই টুকরোর মধ্যে গ্রিল করা গরুর মাংস রেখে খাবারটি পরিবেশন করেছিলেন। এই ঘটনাকেই কেউ কেউ আধুনিক হ্যামবার্গারের সূচনাকাল হিসেবে দেখেন।
অন্য একটি মত অনুযায়ী, ১৯০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে অনুষ্ঠিত বিশ্বমেলার সময় হ্যামবার্গার ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। তখন বিভিন্ন ধরনের দ্রুত পরিবেশনযোগ্য খাবারের সঙ্গে মাংস ও রুটির এই সমন্বয়ও মানুষের নজর কাড়ে।
আবার অটো ক্রাউস নামের এক ব্যক্তিকেও বার্গার তৈরির কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ফলে খাবারটির প্রথম উদ্ভাবক কে—এ প্রশ্নের একক কোনো উত্তর এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
কেন এত জনপ্রিয় বার্গার?
বার্গারের জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো এর সহজ পরিবেশন ও বহুমুখী স্বাদ। একই ধরনের বান ও প্যাটির সঙ্গে উপকরণ বদলে একেক ধরনের বার্গার তৈরি করা যায়। গরু বা মুরগির মাংসের পাশাপাশি মাছ, ডিম কিংবা সবজি দিয়েও বার্গার তৈরি হয়। চিজ, লেটুস, টমেটো, পেঁয়াজ, মেয়োনিজ, কেচাপ ও বিভিন্ন সস যোগ করে স্বাদে আনা হয় আরও বৈচিত্র্য।
আধুনিক সময়ে বার্গার শুধু দ্রুত খাবার হিসেবেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশের রেস্তোরাঁ নিজেদের স্থানীয় স্বাদ ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে এর নতুন নতুন সংস্করণ তৈরি করছে। ফলে এক দেশের জনপ্রিয় বার্গারের স্বাদ আরেক দেশের বার্গার থেকে বেশ আলাদা হতে পারে।
তবে বার্গার উপভোগের পাশাপাশি পুষ্টির বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি। অতিরিক্ত চিজ, সস, লবণ ও তেলযুক্ত বার্গার নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঘরে তৈরি করলে পরিমাণমতো সবজি, তুলনামূলক কম তেল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন ব্যবহার করে খাবারটিকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা যায়।
আন্তর্জাতিক বার্গার দিবসে তাই পছন্দের বার্গার খাওয়ার পাশাপাশি এর দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাসটিও মনে করা যায়। কয়েক শতকের খাদ্যসংস্কৃতির নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে খাবার আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তার জন্মকাহিনি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।