• মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

দুদকে অভিযোগের পাহাড়, ইউনূস আমলের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত

newsline24 / ৬ Time View
Update : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দুদকে অভিযোগের পাহাড়, ইউনূস আমলের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত
দুদকে অভিযোগের পাহাড়, ইউনূস আমলের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামল ঘিরে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের নানা অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটির প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে অভিযোগে উল্লিখিত বিপুল অর্থের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা দাবি এখনো তদন্তের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে সময় দেশের একটি বড় অংশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, নতুন প্রশাসন সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

দুদকে জমা পড়া অভিযোগের একটি বড় অংশে সাবেক উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী এবং সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এসব অভিযোগের মধ্যে দেশ থেকে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদ গঠন, নিয়োগ-বদলি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের অর্থের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগের কথা সামনে এসেছে। অভিযোগে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগও রয়েছে। দুদকের নথিতে পর্তুগালে জমি কেনা এবং দুবাইয়ের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের দাবির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অভিযোগের বর্ণনা অনুযায়ী, চার দেশে কথিত অর্থপাচারের পরিমাণের মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চার দেশের ক্ষেত্রে অভিযোগের অঙ্ক প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

তবে এসব অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং অভিযোগগুলোর পেছনে কতটা বাস্তব ভিত্তি রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

ইউনূস সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। বিচারক, আইন কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রার নিয়োগ-বদলি, জামিন এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে সম্পদ গড়ার দাবিও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করাও তদন্তের বিষয়।

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে দুবাই ও লন্ডনে অর্থ স্থানান্তর এবং ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। একইভাবে সাবেক উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের এক নিকটাত্মীয়ের নামে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বাড়ি কেনার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে ইউনূস সরকারের সময়কার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দুদকে জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ জমা পড়া আর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। দুদকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো যাচাই করে যেগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে, সেগুলো নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাকে দুর্নীতির জন্য দায়ী বলা যায় না; তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি করবে।

অর্থপাচারের প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা অর্থ বৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বাড়ার সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সরকারের দুর্নীতির সরাসরি সম্পর্ক আছে—এমন সিদ্ধান্ত কেবল এই পরিসংখ্যান দিয়ে টানা যায় না।

ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ এখন রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যে প্রশাসন সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রের প্রত্যাশা নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেই প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেই যদি বড় অঙ্কের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তার স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

দুদকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত করা। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের ভিত্তি না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও সেই দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কারণ দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে জনমনে আস্থা ফেরানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো স্বচ্ছ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত এবং আইনের সমান প্রয়োগ। ইউনূস সরকারের আমলে ওঠা অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রেও সেই একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category