নওগাঁর মহাদেবপুরে পাইলসের অস্ত্রোপচারের পর নাছিমা খাতুন (৪২) নামে এক নারীর মৃত্যুর ঘটনায় আল মদিনা ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল সিলগালা করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে মৃত্যুর কারণ ও চিকিৎসাসেবায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সোমবার দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশের সরকার টাওয়ারে অবস্থিত বেসরকারি হাসপাতালটিতে অভিযান চালান নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. মো. আমিনুল ইসলাম। পরে হাসপাতালটি সিলগালা করা হয়।
নাছিমা খাতুন উপজেলার উত্তরগ্রাম ইউনিয়নের চকগৌড়া গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল ইসলামের স্ত্রী। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পাইলসের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাকে আল মদিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পাইলসের অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুর রহমান মন্ডলের সঙ্গে ১২ হাজার টাকায় চুক্তি হয়।
পরিবারের দাবি, ওই দিন রাতেই নাছিমার অস্ত্রোপচার করা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. ইমরান আলী অ্যানেস্থেশিয়া দেন এবং ডা. দেওয়ান মো. আব্দুস সবুর অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে রক্তস্বল্পতার কারণে নাছিমাকে ‘বি’ পজিটিভ গ্রুপের এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয় বলেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে।
তবে অস্ত্রোপচারের পর থেকেই নাছিমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পরদিন রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ তার অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের সহায়তা চাওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসককে তখন পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন স্বজনরা। পরে সকাল ৯টার দিকে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক হাসপাতালে এসে নাছিমাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র নেওয়ার পরামর্শ দেন। এর আগেই তার মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে নাছিমার অস্ত্রোপচারের আগে করা রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে। স্বজন জাকারিয়ার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রতিবেদনে নাছিমার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৪ গ্রাম/ডেসিলিটার। একই দিনে করা আরেকটি প্রতিবেদনে তা ৭ দশমিক ৫ গ্রাম/ডেসিলিটার উল্লেখ করা হয়। দুই প্রতিবেদনে রক্তের অন্যান্য উপাদানেও পার্থক্য ছিল বলে পরিবার জানিয়েছে।
বিশেষ করে প্লাটিলেটের হিসাবেও বড় ধরনের ব্যবধান দেখা যায়। একটি রিপোর্টে প্লাটিলেট ৩ লাখ ৮৪ হাজার এবং অন্যটিতে ৬ লাখ ৫ হাজার উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রিপোর্টের মধ্যে পার্থক্য কেন ছিল এবং অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রোগীর রক্তস্বল্পতার বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের মাধ্যমে বের হয়ে আসার অপেক্ষায় রয়েছে।
মৃতের স্বামী রেজাউল ইসলাম বলেন, অস্ত্রোপচারের পর রাতে তার স্ত্রীর অবস্থা মোটামুটি ভালোই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরদিন সকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে স্বজনদের লিখিতভাবে মীমাংসা হয়েছে বলেও জানান তিনি। একাধিক সূত্রের দাবি, ইউপি সদস্য মকবুল হোসেনের উপস্থিতিতে ওই সমঝোতা হয়। ৩০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা হওয়ার কথাও সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে লিখিত সমঝোতায় অর্থের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না বলে জানা গেছে।
অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ডা. দেওয়ান মো. আব্দুস সবুর বলেন, তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে অস্ত্রোপচার করছেন। রোগীর কাগজপত্র ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। হিমোগ্লোবিন ৭ দশমিক ৪ গ্রাম/ডেসিলিটার থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীকে এক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল।
হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুর রহমান মন্ডল বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন মেডিকেল অফিসারকে দিয়ে অ্যানেস্থেশিয়া ও অস্ত্রোপচার করানো হয়েছিল। চিকিৎসক রোগীর কাগজপত্র ও পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নাছিমার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চিকিৎসকই বিস্তারিত বলতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। মৃত্যুর পর স্বজনদের সঙ্গে লিখিতভাবে মীমাংসার কথাও স্বীকার করেন হাসপাতাল পরিচালক।
এদিকে, ঘটনার পর হাসপাতাল সিলগালা এবং তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে নাছিমার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, পরীক্ষার রিপোর্টে পার্থক্যের কারণ এবং অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর শারীরিক ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।