ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) দলের মুখপাত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করেছে দলটি।
রোববার বিকেলে রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পরে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
সভায় ঢাকার দুই মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়েও আলোচনা হয়। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যা চিহ্নিত করা, সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী বাছাই এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নাশকতামূলক তৎপরতার বিষয়ে নজরদারি রাখতেও নেতাকর্মীদের বলা হয়েছে।
মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এনসিপির আগের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এসেছে। চলতি বছরের মার্চে দলটি জানিয়েছিল, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট না করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন ঢাকা উত্তরে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং দক্ষিণে আসিফ মাহমুদের প্রার্থী হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রায় ছয় মাস পর সেই পরিকল্পনা বদলে উত্তরে আসিফ এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীনকে দায়িত্ব দেওয়া হলো।
প্রার্থী নির্ধারণের আগে দুজনের ভোটার এলাকাতেও পরিবর্তন আনা হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ভোটার এলাকা থেকে দক্ষিণ সিটির ২১ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার হন। অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ দক্ষিণ সিটি থেকে উত্তর সিটির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার এলাকা স্থানান্তর করেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণেই এই পরিবর্তন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন। নাসীরুদ্দীন পান ৫৪ হাজার ভোট। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল তুলনামূলকভাবে কম। সে সময় নাসীরুদ্দীন ঢাকা-১৮ আসনের ভোটার থাকায় ঢাকা-৮ আসনে নিজেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি।
অন্যদিকে সংসদ নির্বাচনের আগে আসিফ মাহমুদ কুমিল্লা-৩ থেকে ঢাকা-১০ আসনের ভোটার হন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি। পরে তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় মেয়র প্রার্থী হওয়ার আগ্রহের কথা জানান। তবে দলীয় জরিপের ভিত্তিতে এবার তাঁকে উত্তরে প্রার্থী করা হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, এনসিপির পরিচালিত কয়েকটি জরিপে ঢাকা উত্তরে তাঁর অবস্থান ভালো এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী পাওয়া গেছে। সেই বিবেচনায় দুজনের ভোটার এলাকা পরিবর্তন করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকার দুই সিটিতে এনসিপির প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো জোট হবে না বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছে জামায়াত। দলটির ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকরা নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী সমঝোতা বা জোটের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিন এবং দক্ষিণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকার উত্তর সিটি এলাকার আটটি আসনের মধ্যে চারটিতে এবং দক্ষিণের সাতটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। ফলে সিটি নির্বাচনেও দলটির অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো।
জোটসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। সেলিমউদ্দিন সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে অল্প ব্যবধানে পরাজিত হন। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা আবু সাদিক কায়েমকে তাঁর নিজ এলাকা খাগড়াছড়ির পরিবর্তে ঢাকার রাজনীতিতে সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ এনসিপির প্রার্থী নির্ধারণেও প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এখনই সিটি নির্বাচন নিয়ে চূড়ান্ত রাজনৈতিক সমীকরণে যাওয়ার সময় হয়নি বলে মনে করছেন এনসিপির নেতারা। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আসিফ মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই হিসাবে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এখনও প্রায় আট থেকে দশ মাস সময় রয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরই নির্বাচনের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও সরকার ও সরকারি দলের আচরণ কেমন হয়, সেটি পর্যবেক্ষণ করা হবে। অতীতের মতো ক্ষমতাসীনরা স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে কি না, তা দেখার পর পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোট বা সমঝোতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এনসিপির দুই প্রার্থীকে ঘিরে এখন ঢাকার স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনের তফসিল, অন্যান্য দলের প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়া এবং সম্ভাব্য জোট বা সমঝোতার চিত্র সামনে না আসা পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার পূর্ণাঙ্গ রূপ স্পষ্ট হবে না।