বুধবার (২৮ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদ্রিদ থেকে সেভিলগামী দুটি দ্রুতগতির ট্রেনে মোট ৫৪৪ জন যাত্রী ছিলেন। ট্রেন দুটির একটি পরিচালনা করছিল রাষ্ট্রায়ত্ত রেল সংস্থা রেনফে, অন্যটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিও। বুধবার সকালে উরদার কাছে ইরিওর ট্রেনটি থেমে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে এসে সেটিকে ধাক্কা দেয় রেনফের ট্রেন। এতে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয় এবং বহু যাত্রী হতাহত হন।
দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকাজ শুরু হয়। তবে কয়েকটি বগি এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেগুলোর নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘আজ পুরো স্পেন শোকাহত।’ নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি তিনি রেল নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
স্পেনের মতো উন্নত রেল অবকাঠামোর দেশেও একই বছরে দুটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সানচেজ বলেন, এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া কঠিন। দুর্ঘটনার পেছনে নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, উচ্চগতির রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন হলে সরকার সেই পদক্ষেপ নেবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতেও আদামুজ শহরের কাছে আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বছরে দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা দেশটির রেল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটির বিষয়টি সামনে এনেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেলপথের অংশে সিগন্যালিং কম্পিউটারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে ম্যানুয়ালি ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পরিবহনমন্ত্রী জানান, নিয়ন্ত্রণকক্ষের অপারেটররাই ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে ওই পরিস্থিতিতে এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর কাছে ব্যাখ্যাতীত বলে মনে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘স্পষ্টতই এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।’ তাঁর মতে, ত্রুটিটি যাচাই করার জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল। কিন্তু সমস্যাটি যথাযথভাবে সমাধান না করেই ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে পরিবহনমন্ত্রী এ পর্যায়ে কাউকে সরাসরি দোষী সাব্যস্ত না করে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, দুর্ঘটনার আগে যোগাযোগ, নির্দেশনা এবং পরিচালনাগত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখা জরুরি।
অস্কার পুয়েন্তে আরও জানান, অন্য একটি ট্রেনের চালক নিয়ন্ত্রণকক্ষের নির্দেশ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেন। পরে নিয়ন্ত্রণকক্ষের অপারেটরও সেই পদ্ধতিতে সম্মতি দেন বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্যের পর রেল পরিচালনায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও চালকদের মধ্যে সমন্বয়, জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ত্রুটিপূর্ণ সিগন্যালিং ব্যবস্থার মধ্যে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কাস্তিয়া-লা মানচা আঞ্চলিক সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় আহত ১০৭ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আঞ্চলিক নেতা এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পেজে আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, উদ্ধারকর্মীরা তখনও কয়েকটি বগির নিচে পৌঁছাতে পারেননি। ফলে সেখানে কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। এ কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এ ধরনের দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা ও স্বজনদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়াও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বড় দায়িত্ব।
নিহতদের মধ্যে ৩১ বছর বয়সী সিভিল গার্ড সদস্য হোসে ম্যানুয়েল চাকন রয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর দুর্ঘটনাটির মানবিক দিককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারের পাশাপাশি আহতদের স্বজনদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রভাব পড়েছে স্পেনের ক্রীড়াঙ্গনেও। শোক ও সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন কোপা দেল রে প্রতিযোগিতার নির্ধারিত ২৪টি ম্যাচ স্থগিত করেছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতার ম্যাচগুলো স্থগিত করার সিদ্ধান্তে দুর্ঘটনার ব্যাপক প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে।
এদিকে বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনেজ ফেইজো দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের অবকাঠামো খাতে কী ঘটছে, তা জানার অধিকার স্পেনের মানুষের রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে রেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা, পরিচালনাগত ত্রুটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের দাবি এখন রাজনৈতিক আলোচনারও অংশ হয়ে উঠেছে।
স্পেনের সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করা, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার কারণ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা। সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটি, নিয়ন্ত্রণকক্ষের সিদ্ধান্ত কিংবা অন্য কোনো কারণ এই বিপর্যয়ের পেছনে ছিল কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে রেল নিরাপত্তায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দুটি বড় দুর্ঘটনায় বিপুল প্রাণহানির পর স্পেনের উচ্চগতির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার জবাব দিতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দিকে এখন তাকিয়ে আছে দেশটির মানুষ।