পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার পরপরই নতুন কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেই ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড নেইমার জুনিয়রের। বরং দীর্ঘদিনের ব্যস্ততা, অনুশীলন ও শারীরিক পুনর্বাসনের কঠোর রুটিন থেকে বেরিয়ে অন্তত এক বছর নিজের মতো করে জীবন কাটাতে চান তিনি। কখনো ফুটবল খেলতে ইচ্ছা হলে মাঠে নামবেন, আবার কোনো দিন কিছুই করতে মন না চাইলে কাটাবেন বিশ্রামে। অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়ে নিজের এমন ভাবনার কথা জানিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফুটবলার।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আগেই বিদায় নিয়েছেন নেইমার। তবে ক্লাব ফুটবল থেকে কবে সরে দাঁড়াবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি তিনি। বর্তমানে ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসের হয়ে খেলা এই তারকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভক্তদের আগ্রহের মধ্যেই অবসরের পরের জীবন সম্পর্কে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন তিনি।
সম্প্রতি ব্রাজিলের অনুষ্ঠান ‘ভারান্দা গুরমে’-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অবসর, ফুটবল দেখার অভ্যাস এবং সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানো নিয়ে কথা বলেন নেইমার। তাঁর বক্তব্যের বরাত দিয়ে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবো।
অবসরের পর বাঁধাধরা রুটিনে থাকতে চান না
দীর্ঘদিন ধরে পেশাদার ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় নেইমারের দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশজুড়েই রয়েছে অনুশীলন, শারীরিক সুস্থতা ধরে রাখার চেষ্টা এবং ফিজিওথেরাপি। ক্যারিয়ারের এই অধ্যায় শেষ হলে অন্তত প্রথম এক বছর এসব বাধ্যবাধকতা থেকে দূরে থাকতে চান তিনি।
অবসরের পর কী করবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নেইমার হাস্যরসের সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি যখন খেলা ছেড়ে দেব, তখন এক বছর কিছুই করব না। এমন হবে আজ ফুটবল খেলতে ইচ্ছা করছে, তাই খেলতে যাব। আজ কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না, তাই কিছুই করব না।’
নেইমারের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, অবসরের পরপরই কোচিং, ধারাভাষ্য কিংবা ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত অন্য কোনো পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার তাড়া নেই তাঁর। বরং নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী সময় কাটানো এবং দীর্ঘদিনের পেশাগত চাপ থেকে বিরতি নেওয়াই হবে তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এটি তাঁর বর্তমান ভাবনা; অবসরের পর বাস্তবে কী করবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা ঘোষণা করেননি তিনি।
মাঠে খেলতে ভালোবাসেন, টিভিতে খেলা দেখা পছন্দ নয়
ফুটবল নেইমারের পেশা, একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা। কিন্তু মাঠে নেমে খেলার আনন্দ আর টেলিভিশনের সামনে বসে অন্যদের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে এক নয়। সাক্ষাৎকারে নিজের এই অভ্যাসের কথাও জানিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা।
বার্সেলোনা ও প্যারিসে থাকার সময় সতীর্থদের সঙ্গে ছুটির দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নেইমার জানান, তাঁর বন্ধুরা অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেলিভিশনে ফুটবল দেখতেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বসে ম্যাচ দেখা তাঁর কাছে খুব একটা উপভোগ্য নয়।
বরং প্রিয় বন্ধুদের খেলায় প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স না দেখলেও তাঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন নেইমার। অর্থাৎ ফুটবলের প্রতি তাঁর টান থাকলেও খেলা দেখার চেয়ে মাঠে নেমে খেলার মধ্যেই বেশি আনন্দ খুঁজে পান তিনি।
নেইমারের এই অভ্যাস তাঁর অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়েও একটি ধারণা দেয়। ফুটবল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘোষণা না দিলেও খেলাটিকে ঘিরে পেশাগত ব্যস্ততা ও নিয়মের বাইরে নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিতে চান তিনি।
ব্যস্ততার মধ্যেও সন্তানদের জন্য আলাদা সময়
পেশাদার ফুটবলারের জীবন শুধু মাঠের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত অনুশীলন, ফিটনেস ধরে রাখা এবং চোটের পর পুনর্বাসনের মতো বিষয়েও অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। নেইমারের জীবনেও এসব ব্যস্ততা রয়েছে। এর মধ্যেও সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোকে গুরুত্ব দেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে নিজের পারিবারিক জীবনের কথা বলতে গিয়ে নেইমার জানান, ব্যস্ত সূচির মধ্যেও সন্তানদের পছন্দের কাজগুলো করার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে মেয়ের সঙ্গে অ্যানিমেটেড সিনেমা দেখার অভ্যাসের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মেয়ে ‘শ্রেক’ ও ‘দ্য গ্রিঞ্চ’ সিনেমা দুটি পছন্দ করে। তাই মেয়ের সঙ্গে বসে এসব সিনেমা দেখেন ব্রাজিলের এই তারকা।
নেইমার বলেন, ‘আমার জীবন খুব ব্যস্ত। ফিজিওথেরাপি করতে হয়, অনুশীলন থাকে। তারপরও সন্তানদের জন্য কিছু সময় আলাদা করে রাখি। ওরা যা পছন্দ করে, সেগুলো করার চেষ্টা করি।’
তাঁর বক্তব্যে ফুটবলের বাইরের জীবনের একটি দিক উঠে এসেছে। মাঠের সাফল্য ও পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অবসরের পর দীর্ঘদিনের ব্যস্ততা কমে গেলে সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানাননি তিনি।
সান্তোসের সঙ্গে চুক্তি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত
অবসরের পর কীভাবে জীবন কাটাতে চান, সে বিষয়ে ধারণা দিলেও নেইমার ঠিক কবে পেশাদার ফুটবল ছাড়বেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্যারিয়ার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে আপাতত বছর ধরে ধরে এগোনোর কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
সান্তোসের সঙ্গে তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে চুক্তির পর তিনি খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ার চালিয়ে যাবেন, নাকি পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানাবেন, তা নির্ভর করছে তাঁর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর।
নেইমারের ক্যারিয়ারে চোট, পুনর্বাসন এবং মাঠে ফেরার লড়াই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে অবসরের পর বাঁধাধরা সময়সূচি ছাড়া জীবন কাটানোর ইচ্ছা তাঁর কাছে স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করতে পারে। তবে তাঁর অবসরের নির্দিষ্ট সময় এখনো অজানা।
একসময় বার্সেলোনা ও প্যারিসের মতো বড় ক্লাবে খেলা এবং ব্রাজিলের জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতানো নেইমার এখন ক্যারিয়ারের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে ভাবছেন। সেই অধ্যায় কবে শুরু হবে, তা নিশ্চিত না হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার—ফুটবল ছাড়ার পরপরই নতুন দায়িত্বে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে চান না তিনি। অন্তত প্রথম এক বছর নিজের ইচ্ছা, পরিবারের সঙ্গ এবং অবসরযাপনের স্বাধীনতাকেই প্রাধান্য দিতে চান এই ব্রাজিলিয়ান তারকা।