বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার আশা জাগালেও অঞ্চলটিতে নতুন করে হামলা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করছে। ফলে একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে অস্থির হয়ে উঠেছে তেলের বাজার।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে দেখা গেছে। তবে আগের দিনের মূল্যবৃদ্ধির পর এই পতনকে স্থায়ী নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কতটা কমে, তার ওপরই আগামী দিনের বাজারের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৫ সেন্ট বা ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১১৪ ডলার ৪৭ সেন্টে দাঁড়ায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ ডলার ১৩ সেন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলার ৬৫ সেন্টে নেমে আসে।
এর আগের দিন চিত্র ছিল ভিন্ন। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছিল। অন্যদিকে ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছিল ৩ শতাংশ। এক দিনের ব্যবধানে দাম বাড়া ও কমার এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক তেলবাজার এখনো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরবরাহসংক্রান্ত খবরের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তেলের বাজারে সাম্প্রতিক ওঠানামার অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলে সংঘাতের আশঙ্কা কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে বিনিয়োগকারীরা তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপথ নতুন করে মূল্যায়ন করছেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। ওই চিঠির মাধ্যমে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই উদ্যোগ বাস্তবে আলোচনার পথ কতটা প্রশস্ত করতে পারে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কূটনৈতিক যোগাযোগের অগ্রগতি হলে সংঘাতের ঝুঁকি কমার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হওয়ার পাশাপাশি তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ বাড়তে পারে। তবে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ আর কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছানো এক বিষয় নয়। তাই শুধু কূটনৈতিক তৎপরতার খবরের ভিত্তিতে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি ফিরে আসবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর একটি। এ অঞ্চলে সামরিক সংঘাত বাড়লে তেল উৎপাদন, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হলে বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সংঘাত প্রশমিত হলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার বিষয়ে আস্থা বাড়লে দাম কমার সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনাই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের সামনে মূলত দুটি বিপরীত সম্ভাবনা রয়েছে। শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি হলে এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা কমলে তেলের দাম আরও কমতে পারে। বিপরীতে, নতুন হামলা, সংঘাতের বিস্তার কিংবা সরবরাহে বড় ধরনের বাধার আশঙ্কা জোরালো হলে দাম আবারও বাড়তে পারে।
বৃহস্পতিবারের লেনদেনে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই—উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও সামনের দিনগুলোতে কোন প্রবণতা প্রাধান্য পাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আগের দিনের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরদিনের দরপতন বাজারের অনিশ্চয়তাকেই সামনে এনেছে।
বাজারের পরবর্তী গতিপথ বুঝতে শান্তি আলোচনার অগ্রগতি, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন হামলার ঘটনা এবং তেল সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনার দিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, উৎপাদন ও মজুতসংক্রান্ত তথ্যও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেই বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম কমে যায় না। আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন খরচ, কর এবং সরকারি মূল্য নির্ধারণের নীতিও স্থানীয় বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলে। একইভাবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাবও স্থানীয় বাজারে পড়তে পারে, যদিও সেই পরিবর্তনের মাত্রা ও সময় একেক দেশে একেক রকম হয়।
সব মিলিয়ে, তেলের বাজারে আপাতত স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি উদ্যোগ বাস্তব অগ্রগতি পায় কি না এবং জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি কমে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে তেলের দাম আরও নামবে, নাকি আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে।