বুধবার সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় নতুন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীর জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আসছে। বিশেষ করে এসআই পদে বিভাগীয় পদোন্নতির পরিবর্তে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানান, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং পুলিশি কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে নতুন পদ সৃজন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করা এবং মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বর্তমানে প্রচলিত পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, উপপরিদর্শক পদের ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান রয়েছে। তবে নতুন সিদ্ধান্তে এই নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এবার ৪ হাজার এসআই পদের সব কটিতেই সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে।
এ জন্য পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি) সংশোধন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত এই নিয়োগের ক্ষেত্রেই শতভাগ সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব।
প্রচলিত নিয়োগব্যবস্থায় বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে এসআই হওয়ার সুযোগ থাকে পুলিশের অধস্তন পদে কর্মরত সদস্যদের। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এবারের ৪ হাজার পদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ থাকছে না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ, পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না আসা এবং স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের মতো বিষয়গুলো নতুন করে জনবল নিয়োগ ও বাহিনী পুনর্গঠনের উদ্যোগে বিবেচনায় এসেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাবের অভিযোগও এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে আলোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তদন্তের ফলাফল বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারের লক্ষ্য, নতুন জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা। তবে শুধু জনবল বাড়ালেই প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। নিয়োগের স্বচ্ছতা, পেশাগত দক্ষতা, প্রশিক্ষণের মান এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে জনবলসংকট পূরণেও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৫২তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিয়োগের পর নির্বাচিত কর্মকর্তাদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময়কাল কিছুটা কমানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে প্রশিক্ষণের সময় ঠিক কতটা কমানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে। পাশাপাশি প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর গোয়েন্দা যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ১৪ হাজার এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে আবেদন গ্রহণ, লিখিত ও অন্যান্য পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা যাচাই, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
এ কারণে নিয়োগপ্রত্যাশীদের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমা, শারীরিক যোগ্যতা, আবেদনপদ্ধতি এবং পরীক্ষার ধাপ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশে নতুন ১৪ হাজার পদে নিয়োগ এবং এএসপি ক্যাডারে আরও কয়েক শ কর্মকর্তা নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাহিনীর জনবল কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগের স্বচ্ছতা, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর।