বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি নিখোঁজ হওয়ার রাতে তাঁর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপ। এ সময় তাঁরা তাহসিফের নষ্ট হয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল মেরামত করান এবং একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে দ্বীপ নিজের বাসায় ফিরে গেলেও তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গণমাধ্যমের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাতের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন শাহরিয়ার দ্বীপ। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে তাহসিফের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে আলাদা হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন।
দ্বীপ জানান, ওই রাতে তাহসিফের মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাঁদের দুজনের মোটরসাইকেল একই মডেলের হওয়ায় এবং নিজের বাইক রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি তাহসিফকে মোটরসাইকেলটি চালু করতে সহায়তা করেন। পরে তাঁরা উত্তরার একটি ওয়ার্কশপে যান। সেখানে ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তনসহ মোটরসাইকেলটির প্রয়োজনীয় কিছু কাজ করানো হয়।
মোটরসাইকেলের কাজ শেষ হলে তাঁরা আবার অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর সেখান থেকে রাজি কমপ্লেক্সের একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাওয়া শেষে দ্বীপ নিজের বাসার উদ্দেশে রওনা হন। অন্যদিকে তাহসিফ কোথায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তাঁর কোনো তথ্য নেই বলে জানান তিনি।
দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো সময়ে প্রায় দুই ঘণ্টা মোটরসাইকেলের কাজ করাতেই কেটে যায়। সব মিলিয়ে রাতের ওই সাক্ষাতে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার সুযোগ হয়েছিল। তবে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর তাহসিফের চলাফেরা বা পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না।
এর আগে বৃহস্পতিবার তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল গণমাধ্যমকে জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর জুনিয়র বন্ধু শাহরিয়ার দ্বীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাঁর ছেলে। বের হওয়ার আগে মাকে বলেছিলেন, একটু কথা বলে ফিরে আসবেন। কিন্তু এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছিলেন না।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে শেষবারের মতো একটি বার্তা পাঠান তাহসিফ। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আম্মু, আমি আসছি।’ এই বার্তাটিই ছিল মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তাহসিফের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরদিন সন্ধ্যার আগে তাঁরা জানতে পারেন, রাজধানীর উত্তরার রাজাবাড়ী ঘাটে নদীতে তাঁর মরদেহ পাওয়া গেছে। স্বাভাবিকভাবে বাসা থেকে বের হওয়ার পর এমন পরিণতির খবর পরিবারকে শোক ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলে দেয়।
তাহসিফের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে শাহরিয়ার দ্বীপ জানান, বয়সে বড় হলেও তাহসিফের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁকে তিনি বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করতেন। তাঁদের মধ্যে শুধু বন্ধুত্বই নয়, পারিবারিক সম্পর্কও ছিল। এমনকি দুই পরিবার একসঙ্গে তাহসিফের বাসায় দাওয়াত খেতে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে জানান দ্বীপ।
দ্বীপের বক্তব্য থেকে নিখোঁজ হওয়ার রাতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বিবরণ পাওয়া গেলেও তাহসিফের পরবর্তী গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। রাতের খাবার শেষে তিনি কোথায় গিয়েছিলেন, কীভাবে রাজাবাড়ী ঘাটে পৌঁছালেন এবং তাঁর মৃত্যুর পেছনে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তাঁর দেওয়া বক্তব্যে নেই।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার আগে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত পরিবারের বক্তব্য ও দ্বীপের বর্ণনায় রাতের কয়েকটি ঘটনার সময়ক্রম উঠে এসেছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ বা ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।