আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক ৫৮ সন্তানের বাবা। চার স্ত্রী ও এত বড় পরিবারের ভরণপোষণ করতে গিয়ে এখন চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থের অভাবে পরিবারের কোনো কোনো শিশুকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়। সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, তাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা এবং পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) খামা প্রেস এজেন্সির এক প্রতিবেদনে সাদিকের পরিবারের এই দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশাল পরিবার সামলাতে গিয়ে সাদিককে প্রতিদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি নিজের সব সন্তানের নাম মনে রাখাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে খাবার খেতে বসলে কখনো কখনো সন্তানদের গুনে দেখেন তিনি। তখন বোঝা যায়, কেউ একজন অনুপস্থিত। সে হয়তো বাইরে কোথাও রয়েছে। আবার অনেক সময় সন্তানের নাম মনে করতে না পেরে তাঁদের ‘আমার ছেলে’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন তিনি।
শুধু আর্থিক সংকট নয়, সন্তানদের বড় করে তোলার দীর্ঘ পথচলায় একাধিক সন্তানকে হারানোর বেদনাও রয়েছে সাদিকের পরিবারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে সাদিক ও তাঁর স্ত্রীরা ১৪ সন্তানকে হারিয়েছেন।
সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। সেখানে একটি গাড়ি বিক্রি করতে পারলে তাঁর আয় হয় প্রায় ১ হাজার আফগানি। কিন্তু এত বড় পরিবারের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই আয় যথেষ্ট নয়। ফলে সংসারের খরচ চালাতে তাঁর কয়েকজন সন্তানকেও কাজে নামতে হয়েছে। তাদের কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে।
পরিবারটির দৈনন্দিন জীবনযাপনও বেশ কষ্টকর। সাধারণত দিনে দুই বেলা খাবার তৈরি করা হয়—সকালের নাশতা ও রাতের খাবার। পরিবারের দুই স্ত্রী রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। শীতকালে সবাই ঘরের ভেতরে একসঙ্গে বসে খাবার খান। গরমের সময় পরিবারের সদস্যরা উঠানে জড়ো হন।
এত মানুষের থাকার ব্যবস্থা করাও কঠিন। কখনো কখনো ছয় থেকে সাতজনকে একটি পাতলা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটাতে হয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যার তুলনায় ঘরবাড়ি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বল্পতা তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে বাড়িটির অবস্থার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, পরিবারটি কতটা প্রতিকূল পরিবেশে বসবাস করছে। ঘরগুলোতে প্রচলিত দরজা-জানালার ব্যবস্থা নেই। দরজার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় পাতলা পর্দা। গোসলের জায়গাটিই কাপড় ও থালাবাসন ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। কখনো কখনো সেটিকে শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহার করতে হয়। এত বড় পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সেখানে কঠিন।
অভাবের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাদিক। তবে পড়াশোনার খরচ বহন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের ব্যবস্থা করতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে সব সন্তানের শিক্ষা, বই-খাতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ।
সাদিক নিজেও পড়তে বা লিখতে পারেন না। নিজের সীমিত সামর্থ্যের কথা তুলে ধরে তিনি সরকার, ত্রাণ সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা, সহযোগিতা পেলে সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারবেন এবং পরিবারের সবার মুখে অন্তত নিয়মিত খাবার তুলে দিতে পারবেন।
প্রতিবেদনে সাদিকের বড় পরিবার গড়ে তোলার পেছনে তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি অনেক সন্তানের বাবা হতে চেয়েছিলেন। তবে এত বেশি সন্তান নিয়ে সংসার চালানোর বাস্তব সমস্যাও এখন তাঁকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সন্তানদের নাম মনে রাখতে না পারার বিষয়টি তাঁর জীবনের নানা বিব্রতকর পরিস্থিতিও তৈরি করেছে। একবার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধর্মীয় নেতার কাছে তিনি ভুল করে এক মেয়ের পরিবর্তে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলেছিলেন। এত বড় পরিবারের সদস্যদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য মনে রাখা তাঁর জন্য কতটা কঠিন, ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ।
সাদিক জানান, তাঁর প্রথম বিয়ের সময় বয়স ছিল ২০ বছর। চার স্ত্রীকে বিয়ে করার আগে প্রত্যেকের বিয়ের মূল্য বা দেনমোহর পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে তাঁকে সময় নিয়ে সঞ্চয় করতে হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর চার স্ত্রী যখন তাঁকে বিয়ে করেন, তখন তাঁদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।
সাদিকের পরিবারের পরিস্থিতি শুধু দারিদ্র্যের চিত্রই তুলে ধরে না; এটি বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং ঘন ঘন গর্ভধারণের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন সামনে আনে।
কৈশোরে বিয়ে ও গর্ভধারণের ফলে মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অল্প বয়সে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন জটিলতা এবং প্রসবসংক্রান্ত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অন্যদিকে, বারবার গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কারণে মায়েদের শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। পর্যাপ্ত পুষ্টি, বিশ্রাম ও চিকিৎসা না পেলে এসব ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এ ধরনের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বড় পরিবারের সদস্যদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সেখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মোহাম্মদ সাদিকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া দুটি—সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা এবং পরিবারের সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করা। ৫৮ সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সীমিত আয়ে জীবন চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য যে কতটা কঠিন, পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতিই তার প্রমাণ। তাঁর আবেদন, সরকারি সহায়তা, মানবিক উদ্যোগ ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতায় যেন সন্তানদের জন্য আরও নিরাপদ ও ভালো জীবন গড়ে তোলা সম্ভব হয়।