সরকারি কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বনভূমি দখল করে বসবাসের অভিযোগে এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলোর দাবি, তাদের অনেককে কয়েক দশক আগে সরকারই ওই এলাকায় পুনর্বাসিত করেছিল। ফলে জমির মালিকানা ও বসবাসের বৈধতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের বক্তব্যে স্পষ্ট বিরোধ দেখা দিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ অক্টোবর রোববার নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। এর আগের দিন, ১৭ অক্টোবর, নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় আরও ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এসব অভিযানে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। উচ্ছেদের শিকার অধিকাংশ পরিবারই বাংলাভাষী মুসলিম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭ অক্টোবর পরিচালিত অভিযানে তিন জেলার উচ্ছেদের চিত্র ছিল এমন—
নগাঁও: ৩৩৬টি পরিবার
গোলাঘাট: ৫৯টি পরিবার
হোজাই: ১৫২টি পরিবার
সব মিলিয়ে এক দিনেই ৫৪৭টি পরিবারকে তাদের বসতবাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরদিন লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আরও ৬০০টির বেশি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়। দুই দিনের অভিযানে মোট উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সংখ্যা ১১০০ ছাড়িয়ে গেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি অবৈধভাবে দখল করে এসব পরিবার বসবাস করছিল। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তাদের বসতি গড়ে ওঠার পেছনে সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগ এবং বন বিভাগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কর্মসম্পর্কের ইতিহাস রয়েছে।
লুতুমারি এলাকার বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী আবদুন নূর জানিয়েছেন, ১৯৭৪ সালে সরকার তাদের পরিবারগুলোকে ওই এলাকায় পুনর্বাসিত করেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন হওয়ায় সরকার তাদের সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়।
আবদুন নূরের দাবি, সে সময় প্রায় ৩০০টি ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি দেওয়া হয়েছিল। এসব পরিবারের অনেকে পরবর্তী সময়ে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবেও কাজ করেন।
নিজের বাড়ি ভেঙে দেওয়ার পর নূর বলেন, উচ্ছেদ ঠেকাতে তারা গৌহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে আদালত থেকে কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
উচ্ছেদ অভিযানে ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই বাসিন্দা। তাঁর ভাষ্য, কয়েকটি মসজিদের বয়স ৫০ বছরেরও বেশি। দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাসকারী মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে এসব স্থাপনা যুক্ত ছিল।
তবে মসজিদগুলো ভাঙার বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্যের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে স্থাপনাগুলোর সংখ্যা, অবস্থান এবং সেগুলো অপসারণের প্রশাসনিক ভিত্তি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ সীমিত।
লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ নিয়ে এর আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস। গত জুনে সংগঠনটি আসাম সরকারকে ওই এলাকার গ্রামবাসীদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বন্ধ করার আহ্বান জানায়।
সংগঠনটির বক্তব্য ছিল, ওই বনাঞ্চলের চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রচলিত ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় সেখানে বসতি গড়ে দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে তাদের সাধারণ বনভূমি দখলকারী হিসেবে বিবেচনা করার আগে বসতি স্থাপনের ইতিহাস ও বন ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
টংগিয়া পদ্ধতিতে বনাঞ্চলের বাসিন্দারা বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ করতেন। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান গাছের সঙ্গে খাদ্যশস্য চাষের সুযোগও থাকত। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে এ পদ্ধতি চালু হয়। পরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি আসামের কিছু এলাকাতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লুতুমারি লংজাপ বনাঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি গ্রাম হলো কন্দর্প লংজাপ, পদুমনি, হাতিজুর ও ৯ নম্বর খেরোনি। এসব গ্রামের বাসিন্দাদের বসতি কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক নথি ও সরকারি পুনর্বাসনসংক্রান্ত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
আসামে সরকারি জমি ও বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই বিতর্ক চলছে। রাজ্য সরকার সাধারণত বনভূমি ও সরকারি জমি দখলমুক্ত করার যুক্তিতে এসব অভিযান পরিচালনা করে। অন্যদিকে উচ্ছেদের শিকার মানুষের একাংশ পুনর্বাসন, দীর্ঘদিনের বসবাস এবং জীবিকার অধিকার বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছেন।
দ্য স্ক্রলের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) গত ১০ বছরের শাসনামলে আসামে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাজ্যের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশই মুসলিম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই পরিসংখ্যানের মধ্যে কতটি পরিবার বনভূমি থেকে এবং কতটি অন্যান্য সরকারি জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিভাজন প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। একইভাবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর কতজন পরবর্তী সময়ে পুনর্বাসন পেয়েছেন, তারও পূর্ণাঙ্গ হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।
লুতুমারির সাম্প্রতিক অভিযান ঘিরে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—সংরক্ষিত বনাঞ্চল রক্ষার সরকারি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের ইতিহাস, জীবিকা ও মানবিক পরিস্থিতি কীভাবে বিবেচনা করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ এবং সরকারের জমি দখলমুক্ত করার অবস্থানের মধ্যে এই বিরোধের নিষ্পত্তিতে প্রাসঙ্গিক নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আদালতের আদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।