কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতের অনিরাপদ স্থানে গোসলে নেমে সাগরের প্রবল ঢেউ ও স্রোতে ভেসে যাওয়া পর্যটকদের মধ্যে মুহাম্মদ হারুন (২১) নামে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে হিমছড়ি সৈকতে তার মরদেহ ভেসে আসে। এ ঘটনায় নিখোঁজ থাকা আরেক পর্যটক এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের (২৩) সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
উদ্ধার হওয়া হারুন চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার বাসিন্দা। জেলা প্রশাসনের সৈকতকর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ঢেউয়ের তোড়ে মরদেহটি সৈকতে ভেসে আসে। পরে তীরে অপেক্ষায় থাকা তার বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর মরদেহটি কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে হিমছড়ির ম্যারিনা রিসোর্টের জাদুঘর-সংলগ্ন সৈকতের অনিরাপদ স্থানে গোসলে নেমে স্রোতের কবলে পড়ে তিন পর্যটক তরুণের মৃত্যু হয়। তারা হলেন আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম (২৪) ও সাইবুল হক জিসান (২৩)। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন তাদের মরদেহ উদ্ধার করেন। একই সময় একজনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে নিখোঁজ থাকা দুজনের মধ্যে হারুনের মরদেহ পাওয়া গেলেও নিবিড়ের সন্ধান এখনো মেলেনি।
জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম এসব তথ্য জানিয়েছেন। নিখোঁজ পর্যটককে উদ্ধারে সৈকতকর্মী, লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার উত্তরা থেকে সাত তরুণ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বের হন। তারা হলেন সামিন ইসরাত নাফি (২৩), রুহুল আমিন শাফি (২৩), ঐশ্বর্য অক্ষর (২৩), সুফি আমিন নাবিল (২২), আল মাহিবুর ইবনে মোকাররম (২৪), সাইবুল হক জিসান (২৩) ও এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড় (২৩)। প্রথমে তারা বান্দরবানে যান। সেখানে দুই দিন ভ্রমণ শেষে ২১ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজারে পৌঁছান।
কক্সবাজার শহরে না উঠে তারা দুপুর ১টার দিকে হিমছড়ির প্যাঁচার দ্বীপে জাদুঘর-সংলগ্ন ‘সৌরণেষ্ট’ নামের একটি রিসোর্টে ওঠেন। খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রাম শেষে বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে তারা সমুদ্রে গোসল করতে যান। কিন্তু যে স্থানে তারা পানিতে নেমেছিলেন, সেটি পর্যটকদের গোসলের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ এলাকা ছিল না।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সাত তরুণের কেউই সাঁতার জানতেন না। পানিতে খেলাধুলার একপর্যায়ে তারা কাছাকাছি গোসল করতে থাকা আরও কয়েকজন যুবককে পানিতে ডুবে যেতে দেখেন। তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে সাত তরুণও সাগরের ঢেউ ও স্রোতের কবলে পড়ে ভেসে যেতে থাকেন।
এ সময় স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসেন। তাদের প্রচেষ্টায় একজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্যদের সবাইকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করা যায়নি। পরে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ দুজনের একজন হারুনের মরদেহ বৃহস্পতিবার সকালে পাওয়া যায়।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিওনের পুলিশ সুপার নিশাদ এঞ্জেলা জানান, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনো নিখোঁজ অপর পর্যটকের খোঁজে একাধিক দল কাজ করছে।
তিনি বলেন, সৈকতের ওই স্থানটি গোসলের জন্য পরিচিত বা নিরাপদ নয়। সেখানে সাগরের পরিস্থিতি ও পানির স্রোত সম্পর্কে পর্যটকদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সাত তরুণের কেউ সাঁতার জানতেন না বলেও জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাগরে নামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পর্যটকদের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, বেড়াতে এসে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা মুহূর্তের মধ্যে আনন্দকে বিষাদে পরিণত করে। সৈকতে পানিতে নামার আগে নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে এবং দায়িত্বে থাকা কর্মীদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
কক্সবাজার ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, ইনানীর পাটুয়ারটেকে একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনার শোক কাটতে না কাটতেই হিমছড়ি সৈকতে প্রাণহানির ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনিরাপদ স্থানে গোসল করতে নেমে একাধিক পর্যটকের মৃত্যু এবং একজনের নিখোঁজ থাকার ঘটনা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
সাগরে গোসলের ক্ষেত্রে শুধু পানির ওপরিভাগ শান্ত দেখালেই নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই। ঢেউ, পানির নিচের স্রোত ও সমুদ্রতলের গঠন অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে অপরিচিত স্থানে এবং সাঁতার না জেনে পানিতে নামলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের নিরাপত্তাব্যবস্থা, সতর্কসংকেত এবং পর্যটকদের সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। নির্ধারিত নিরাপদ এলাকার বাইরে পানিতে না নামা, লাইফগার্ড ও সৈকতকর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সাগরে নামা থেকে বিরত থাকাই এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর অন্যতম উপায়।
বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নিখোঁজ পর্যটক এসএম নাফিসুর রহমান নিবিড়ের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।