সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে তিনজন শিশু। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের তাইফে হুথিদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন নিহত ও দুজন আহত হন। একই দিনে ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর হামলায় তিন শিশু নিহত হওয়ার দাবি করেছে হুথি-সমর্থিত গণমাধ্যম।
সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাইফ গভর্নরেটে একটি হুথি ড্রোন প্রতিহত করার পর সেটির ধ্বংসাবশেষ একটি এলাকায় পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তি ইয়েমেনের বাসিন্দা ছিলেন। আহত দুজনের মধ্যে একজন সৌদি নাগরিক এবং অন্যজন পাকিস্তানি নাগরিক বলে আলাদা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চলতি মাসে হুথিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে এটিই প্রথম প্রাণহানির ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (Al Jazeera)
অন্যদিকে ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে সৌদি বিমান হামলার অভিযোগ করেছে হুথিরা। তাদের দাবি, সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান তিনটি যোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। হুথি-সমর্থিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, আবস এলাকায় হামলায় একজন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত ও আরেকজন আহত হয়েছেন। পরে একই গণমাধ্যম জানায়, সৌদি সমর্থিত বাহিনীর হামলায় তিন শিশু নিহত এবং কয়েকজন ইয়েমেনি আহত হয়েছেন। (Al Jazeera)
তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে বিভিন্ন ফ্রন্টে লড়াই চলার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হতাহতের এসব তথ্যের বড় অংশই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবি; সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। (ANSA.it)
নতুন করে উত্তেজনা আরও বাড়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠানোর দাবি ঘিরে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হুথিদের ছোড়া ওই ড্রোন প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। তবে হুথি নেতা আবদেল-মালেক আল-হুথি সরাসরি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি সৌদি দাবিকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ ও প্রচারণা হিসেবে আখ্যা দেন। তার বক্তব্য, মক্কার পবিত্রতা হুথিদের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। (Al Jazeera)
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেইও মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থানে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তবে শুধু একটি ড্রোন প্রতিহতের দাবি দিয়ে হুথিদের দায়ী করা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি ঘটনাটিকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ কর্মকাণ্ড হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন। এটি ইরানের পক্ষের বক্তব্য; এর স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। (Al Jazeera)
সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কুয়েত ও বাহরাইন সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে হুথি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও হুথিদের সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। (Al Jazeera)
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের অনুরোধের পর চীন ইরানের মাধ্যমে হুথিদের সামরিক তৎপরতা কমানোর বিষয়ে বার্তা দিয়েছে বলে কয়েকটি ইরানি সূত্র জানিয়েছে। বেইজিং প্রকাশ্যভাবে সংযম, সংলাপ এবং নিরাপদ নৌ চলাচল পুনর্বহালের আহ্বান জানিয়েছে। (Reuters)
এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সৌদি আরবের সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাস্তবায়নের সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন। একই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। (Al Jazeera)
ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমিও দাবি করেছেন, তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বাইদা ও দালেয়সহ বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতিও সাময়িক বলে দাবি করেছেন তিনি। এসব বক্তব্যও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। (Al Jazeera)
নতুন করে সীমান্তপারের হামলা শুরু হওয়ায় ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত আবারও আঞ্চলিক উত্তেজনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। সৌদি ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা এবং ইয়েমেনে পাল্টা বিমান হামলা অব্যাহত থাকলে বেসামরিক মানুষের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যেই কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। (Reuters)