ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের এক নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্যকে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে স্মার্টফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অ্যাপ চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর নাম মো. ফেরদাউস। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তৎকালীন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফেরদাউসকে ‘পরীক্ষা + ১’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ, যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। ফলে তার ১০৭ নম্বর কোর্সের রিটেক পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী একটি পূর্ণ শিক্ষাবর্ষ বা সেমিস্টারের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না তিনি।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১০৭ নম্বর কোর্সের রিটেক পরীক্ষা চলাকালে আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে ফেরদাউস পরীক্ষার হল থেকে বের হন। তিনি শৌচাগারে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে বিভাগের করিডরে গিয়ে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একটি স্মার্টফোন নেন বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ফোন ব্যবহার করে তিনি চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নজরে এলে তারা তাকে আটক করেন।
পরে জব্দ করা স্মার্টফোনের সার্চ হিস্ট্রি পরীক্ষা করা হয়। সেখানে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোই অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এ ঘটনাকে পরীক্ষায় অসদুপায়ের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক ফেরদাউসের খাতা রিপোর্ট করেন। এরপর নিয়ম অনুযায়ী খাতাটি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, পরীক্ষায় অসদুপায়ের অভিযোগটি শৃঙ্খলা পরিষদে পাঠানো হয়। গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সুপারিশ দেওয়া হয়।
পরে ৩১ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ফেরদাউসের বিরুদ্ধে শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত এক আদেশে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে উত্তর সংগ্রহের অভিযোগের গুরুত্বও উঠে এসেছে। বর্তমানে চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি পড়াশোনা, গবেষণা ও লেখালেখিতে ব্যবহৃত হলেও পরীক্ষার হলে অনুমতি ছাড়া এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মের পরিপন্থী হতে পারে। তবে কোনো পরীক্ষায় প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি থাকবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিধি ও পরীক্ষার নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।
শুধু ফেরদাউস নন, একই সিন্ডিকেট সভায় পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মোট ৬৪ শিক্ষার্থীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের ধরন ও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ‘পরীক্ষা + ১’, ‘পরীক্ষা + ২’ এবং ‘পরীক্ষা + ৩’ মেয়াদে শাস্তির আওতায় আনা হয়। এসব শাস্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি নির্দিষ্টসংখ্যক পরবর্তী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে।
তবে ৬৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে কোন অপরাধে কতজনকে কোন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ফেরদাউসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অন্য শিক্ষার্থীদের শাস্তির ধরন এক নয়—এ বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে অসদুপায়ের অভিযোগ তদন্ত ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। ফেরদাউসের ঘটনায় অভিযোগ যাচাই, জব্দ করা ফোনের তথ্য পরীক্ষা, শৃঙ্খলা পরিষদের সুপারিশ এবং সিন্ডিকেটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে।