রাজবাড়ীতে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে এক কলেজছাত্রকে মাদকসহ আটকের কথা বলে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতারণার এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ফরিদপুর ও মুন্সিগঞ্জে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে রাজবাড়ী সদর থানা-পুলিশ।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মটরা গ্রামের চান মিয়া (৫৪) ও একই গ্রামের হাফিজুল মাতুব্বর (৩০)। বুধবার রাতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ভাঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জের পদ্মা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২ লাখ ২২ হাজার ৫০ টাকা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ছয়টি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, দুটি বাটন ফোন এবং বিভিন্ন অপারেটরের ১২টি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের ব্যবসায়ী মোন্নাফ শেখের ছেলে হুসাইন শেখ (২২) ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে পড়াশোনা করেন। তিনি নিয়মিত রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুরে যাতায়াত করেন। বুধবারও প্রতিদিনের মতো কলেজে গিয়েছিলেন তিনি।
সেদিন সকাল ১০টার দিকে রাজবাড়ী সদর থানার আওতাধীন মাটিপাড়া বাজারের চার রাস্তার মোড়ে ছিলেন মোন্নাফ শেখ। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোনে একটি কল আসে। অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে জানান, হুসাইন শেখ ও তাঁর দুই বন্ধুকে মাদকদ্রব্যসহ আটক করা হয়েছে।
ফোনে আরও বলা হয়, টাকা না দিলে হুসাইনের বিরুদ্ধে মাদক মামলা দেওয়া হবে এবং তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হবে। এ সময় তাঁর পরিবারের কাছে ৭০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ছেলের বিপদের কথা ভেবে মোন্নাফ শেখ টাকা দিতে রাজি হয়ে যান।
এরপর তাঁকে টাকা পাঠানোর জন্য আরেকটি মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়। পরে আলাদিপুর বাজারের বিভিন্ন দোকান থেকে মোবাইল ফোনের আর্থিক সেবার মাধ্যমে তিন দফায় মোট ৫০ হাজার টাকা পাঠান তিনি। টাকা পাঠানোর পর ওই নম্বরগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সন্দেহ তৈরি হলে মোন্নাফ শেখ বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তাঁর ছেলে হুসাইন বাড়িতেই আছেন। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে তাঁকে ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর মোন্নাফ শেখ রাজবাড়ী সদর থানায় গিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর ও লেনদেনের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে ভাঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জের পদ্মা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চান মিয়া ও হাফিজুল মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, একাধিক মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড উদ্ধারের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও অন্যান্য সম্ভাব্য সদস্যের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে ফোন করে কাউকে গ্রেপ্তার, মামলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করা হলে কোনোভাবেই টাকা পাঠানো উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ফোনে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতারকেরা সাধারণত পরিবারের সদস্যকে বিপদে পড়ার কথা বলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ দেয়। এ ধরনের ফোনে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার পিন, ওটিপি কিংবা গোপন তথ্য না দিয়ে আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা জরুরি। সন্দেহজনক লেনদেন হয়ে গেলে দ্রুত থানায় অভিযোগ করাও গুরুত্বপূর্ণ।