সিলেটে হাফিজিয়া মাদ্রাসার দুই শিক্ষার্থী তিন দিন ধরে নিখোঁজ। এর মধ্যে এক শিক্ষার্থীকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মারধরের দৃশ্য ভিডিও কলে দেখিয়ে তাঁর পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। টাকা না দিলে ওই শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারের অভিযোগ। ঘটনায় নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবক ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ শাহপরান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থী হলো তামিম আহমেদ ও সাঈদ মাসুদ চৌধুরী (নাঈম)। তাদের দুজনেরই বয়স ১৫ বছর। তারা সিলেট নগরের খাদিমপাড়া এলাকার জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার হিফজ বিভাগে পড়াশোনা করে। তামিম দক্ষিণ সুরমার বড়াইকান্দি এলাকার আবদুস সাত্তারের ছেলে। আর সাঈদ জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের মউগ্রামের বেবুল আহমদের ছেলে।
অভিভাবক, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে ফজরের নামাজের সময় দুজন মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাননি।
এর মধ্যেই সাঈদের বাবা বেবুল আহমদের ইমো অ্যাপে একটি নম্বরহীন অ্যাকাউন্ট থেকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে টাকা দাবি করা হয়। পরে ওই অ্যাকাউন্ট থেকেই ভিডিও কল আসে। কলের সময় সাঈদকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মারধর করার দৃশ্য দেখানো হয় বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিওও পাঠানো হয়।
বেবুল আহমদের ভাষ্য, পরে একটি বিকাশ নম্বর দিয়ে এক লাখ টাকা পাঠাতে বলা হয়। টাকা না দিলে তাঁর ছেলেকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। তবে কারা এই অর্থ দাবি করেছে বা তারা কোথা থেকে যোগাযোগ করছে, সে বিষয়ে পরিবারের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তিনি বলেন, মাদ্রাসা থেকে সাঈদ বাড়িতে গেছে কি না, তা জানতে শিক্ষকরা প্রথমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন পরিবার থেকে জানানো হয়, সাঈদ বাড়িতে ফেরেনি। এরপর স্বজনেরা সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেন। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি। পরে ইমোতে অর্থ দাবির বিষয়টি সামনে আসে।
তামিমের বাবা আবদুস সাত্তার জানান, তাঁর ছেলে এর আগেও দুবার মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে বাড়িতে চলে গিয়েছিল। পরে তিনি নিজেই গিয়ে ছেলেকে মাদ্রাসায় দিয়ে আসেন। এবারও ছেলের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
জাবালে নূর হাফিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালক তোফায়েল আহমেদ জানান, মঙ্গলবার ফজরের নামাজের সময় তামিম ও সাঈদ একসঙ্গে মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে বিষয়টি তাদের পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। দুই শিক্ষার্থী একসঙ্গে বের হওয়ার পর থেকে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা শাহপরান থানায় জিডি করেন। পুলিশও নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের সন্ধানে তৎপর রয়েছে।
শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস আহমেদ জানান, দুই শিক্ষার্থীর ছবি দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়েছে। পুলিশ তাদের সন্ধানে সাধ্যমতো চেষ্টা করছে।
ইমোতে অর্থ দাবির বিষয়টি নিয়েও পুলিশ যাচাই করেছে। ওসি জানান, যে নম্বরটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার পর সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র এ ধরনের অর্থ দাবির ঘটনা ঘটাতে পারে।
পুলিশের কাছে পাঠানো ভিডিওটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ওসি বলেন, ইমোতে পাঠানো কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওটি অস্পষ্ট। ভিডিওতে যা দেখা যাচ্ছে, সেটি নিখোঁজ সাঈদই কি না এবং অর্থ দাবির সঙ্গে নিখোঁজের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
এদিকে দুই কিশোরের পরিবার দ্রুত তাদের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। বিশেষ করে সাঈদকে মারধরের ভিডিও দেখিয়ে টাকা দাবির ঘটনায় পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তবে ভিডিও ও ইমো অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে এবং একই সঙ্গে দুই শিক্ষার্থীর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীকে উদ্ধারে পুলিশ কী ধরনের অগ্রগতি করেছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।